রবিবার রাত আটটা।
অভি ক্লান্ত মুখে বাড়ি ফিরল। দরজায় কলিং বেল বাজালো।
মা এসে দরজা খুলে দিলো আর বললো - ঐশী এখনও আছে। ঘরে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
অভি ধীরে জুতো খুলে রাখতে রাখতে বললো - "ও এখনও বাড়ি যায়নি? রাত আটটা বাজে, কাল তো ওর কলেজ আছে!"
ঠিক তখনই ঐশীও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। উৎকণ্ঠা মিশ্রিত কন্ঠে বললো - "হ্যাঁ, আমি বাড়ি যাবো। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।"
মা বললো - "ঠিক আছে, অভি তুই ওকে ওর বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসবি।"
অভি - "ঠিক আছে মা।"
ঐশী - "আরে নাহ্ কাকিমা, আমি একাই চলে যেতে পারবো, ও অনেক ক্লান্ত হয়ে এসেছে, একটু রেস্ট নিক।"
মা - "নাহ্ মা, তুমি পাকামি কোরো না, আমি যেটা বলেছি, সেটাই ও করবে। আমি তোমাকে একলা ছাড়তে পারবো না। ও যতই ক্লান্ত হোক, এটা এখন ওর ডিউটি, নিজের হবু স্ত্রীয়ের দায়িত্ব নেওয়া।"
ঐশীকে তার হবু শাশুড়ী যে এত আপন ভেবে নিয়েছে, সেটা ভেবে ঐশী আরও নিশ্চিন্ত হলো।
মা তার নিজের ঘরে যেতে যেতে অভিকে বললো -
"ফ্রেশ হয়ে ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে ঐশীকে দিয়ে আসবি।"
অভি -
"হ্যাঁ মা।"
এদিকে ঐশীর চোখে একরাশ উৎকণ্ঠা। অভির হাত ধরে অভির ঘরে যেতে যেতে -
“এত দেরি হলো, সব ঠিক আছে তো?”
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বললো -
“হ্যাঁ… সব ঠিক আছে।"
ঐশী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সে শুধু অভির পিছন পিছন অভির ঘরে টেনে বসিয়ে দিলো। রান্নাঘর থেকে গরম দুধ এনে তার সামনে ধরল।
“এই নাও, আগে এটা খাও। তারপর যা বলতে ইচ্ছে করে বলবে।”
অভি তাকিয়ে রইল ঐশীর দিকে।
মনে হলো—এই মেয়েটার চোখের ভেতরেই তার সমস্ত নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।
দুধটা এক চুমুক খেলো অভি।
তারপর আস্তে আস্তে সব খুলে বলল—কফি হাউসে সৃজিতার সঙ্গে দেখা, পুরোনো স্মৃতির কথা, কেমন করে সে আবার টানতে চাইছিলো অভিকে পুরোনো ঘূর্ণিতে।
সব শুনে ঐশী একটুও বিচলিত হলো না।
শুধু মৃদু হেসে বলল—
“ও চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তুমি আজ যেটা, সেটা তো আর অকারণে হয়নি। তবে তুমি জানো তো অভি, তোমার জায়গাটা কোথায়?”
অভি বিস্মিত চোখে তাকাল।
“কোথায়?”
ঐশী হাত বাড়িয়ে অভির মাথা টেনে নিলো তার বুকে।
“এখানে।”
অভির বুকের ভেতর চাপা কাঁপনটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল।
সে নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
“ঐশী, তুমি না থাকলে আমি আজ সত্যিই ভেসে যেতাম। পুরোনো স্মৃতি বড় কষ্ট দেয়। কিন্তু তুমি আমার ভেতরে নতুন এক আলো জ্বেলে দিয়েছো।”
ঐশী চুপচাপ ওর কপালে হাত রাখল।
“তাহলে আর ভাবনা কিসের? তোমার অতীত তোমাকে কাঁদাতে পারে, কিন্তু বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আমি তোমার জন্য সাজিয়ে রাখবো। তুমি শুধু আমার ওপর ভরসা রেখো।”
অভি চোখ বুজে ঐশীর হাত শক্ত করে ধরল।
মনে হলো—এটাই তার একমাত্র সত্যিকারের আশ্রয়।
অভি মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিলো, ওর ঐশীকে বললো - "এবার চলো তোমায় ছেড়ে দিয়ে আসি।"
ঐশী - "কি দরকার ছিলো গো!"
অভি - "না, আমি তোমাকে আর কোনও কিছুতেই হারাতে চাইনা ঐশী; রাত হচ্ছে, আর মা স্ট্রিক্টলি বলে দিয়েছে, এরপর তোমার আর কোনও আপত্তি থাকতে পারেনা।"
ঐশী - "ঠিকাছে বাবাহ্, আমি আর মানা করবো না তোমায়।"
অভি নিজের গাড়ি বার করলো, সামনের সিটে পাশেই বসলো ঐশী। সিট বেল্ট পড়ে নিলো দুজনে। তারপর মিনিট দশেকের নীরবতা। ইতিমধ্যে ঐশীর বাড়ি পৌঁছে গেলো। ঐশী নেমেই দেখলো আশেপাশে কেউ দেখছে কিনা, তারপর অভির দিকে তাকিয়ে বললো - "টাটা," তারপর মৃদু হেসে মৃদু কন্ঠে, "কাল আসবো শ্বশুরবাড়ি কলেজ ফেরত!!"
অভিও হেসে ফেললো আর হ্যাঁ সূচক সম্বোধন করে গাড়ি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
অভি বাড়ি ফিরে, বাকিদের সাথে রাতের খাওয়ার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।
বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে ধীরে ধীরে। কিন্তু ভেতরে, অভির জীবনে যেন নতুন এক নিশ্চিন্ত আলো জ্বলে উঠেছে।
চলবে…
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন