রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ২৪: বাবার সামনে সত্য

সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়লেও ঐশীদের বাড়িতে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে এসেছে। ঐশী তাদের ডাইনিং রুমের এক কোণে চুপচাপ বসে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মা তখনো ঘরের একপাশে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর ঠোঁট যেন সিল করা। ঘরের ভেতর বাতাস যেন থমথমে।

ঠিক তখনই ঐশীর বাবা ঘুম থেকে উঠে এলেন এবং কোনও দিকে না তাকিয়ে সকালের সমস্ত দৈনন্দিন অভ্যাস সারতে লাগলেন। সবকিছু হয়ে গেলে অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে স্ত্রী'কে তার প্রাতঃরাশ দেওয়ার জন্য বলে ডাইনিং টেবিলে এসে দৈনন্দিন পত্রিকা নিয়ে বসলেন আর সাথে টিফিনটাও তার অফিসব্যাগে গুছিয়ে দিতে বললেন।

ঐশীর মা গম্ভীর মুখে ঋদ্ধিমান বাবুর (ঐশীর বাবা) সামনে প্রাতঃরাশ দিয়ে টিফিন ব্যাগে দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে টেবিলের আরেক প্রান্তে এসে বসলেন।

বাবা কাগজ পড়তে পড়তে (হালকা বিরক্ত স্বরে):
“আজকাল যে কি সব হচ্ছে, কাগজ খুললেই হেডলাইন শুধু ধর্ষণ, খুন, পরকীয়া এসব। ভালো কোনও খবর থাকেনা, ধুর!! তবে একটা খবর খুব ভালো লাগলো, একজন বাঙালি সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত New India Foundation Fellowship Award এর জন্য নমিনেটেড হয়েছে। এই অঞ্চলের ছেলে। খুব ট্যালেন্ট আছে বলতে হবে। যদিও আমি খুব একটা সাহিত্য চর্চা করার সময় পাইনা। তবুও আমাদের অঞ্চলের নাম তো উজ্জ্বল করছে।" বলে কাগজ পাশের চেয়ারে রেখে দিলেন।

বাবার মুখে 'অভিনব গুপ্ত' নামটা শুনেই ঐশীর বুকটা ধক করে উঠলো; ঐশী আর তার মা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো।

প্রাতঃরাশ খেতে খেতে - "কি ব্যাপার, আমি এতো সব কথা বলছি, অথচ দুজনেই এতো চুপচাপ!!"

তারপর ঐশীর দিকে তাকিয়ে কি ব্যাপার ঐশী মা, তুমি এত সকাল সকাল উঠে পড়েছো যে!!" খাওয়ার মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ থেমে "ওই কোনায় বসে আছো কেনো, দিদি(অর্পিতা) বা বোন(ঈশা) এর সাথে সাত সকালে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?" তারপর স্ত্রীয়ের দিকে তাকিয়ে "নাকি মা বকা দিয়েছে?"

ইন্দ্রানী দেবী (ঐশীর মা): হ্যাঁ, তুমি তো কেবল আমাকে ওদের বকতেই দেখো!"

এদিকে ঐশীর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। মায়ের চোখ তাঁর দিকে ছুটে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ঐশী ধীরে ধীরে দাঁড়াল।

ঐশী (কাঁপা গলায়):
“বাবা… একটা কথা বলতে চাই।”

বাবা (চশমার ফাঁক দিয়ে কড়া দৃষ্টি ছুঁড়ে):
“বল! কিন্তু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নয়।”

ঐশী গভীর শ্বাস নিল। গলার স্বর যেন আটকে যাচ্ছিল—
“আমি… আমি ভোরবেলা অভির বাড়ি গিয়েছিলাম।”

বাবা খানিকক্ষণ চুপ থেকে - "অভি আবার কে মা?"

ঐশী: "বাবা তুমি যার কথা কিছুক্ষণ আগে বলছিলে, অভিনব গুপ্ত।"

বাবা (বিস্ময়ে মেয়ের দিকে চেয়ে):
“কি বললি? অভিনব গুপ্তর বাড়ি? উনি তো একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, আর তুই ভোর ভোর ওর বাড়ি? কেন? তুই চিনিস তাকে? পরিচয় আছে?”

ঐশী: হ্যাঁ, আছে বাবা!! আমাদের কলেজে এক সেমিনারে এসেছিলো, আমি নিজে তার সাথে পরিচয় করি। মাঝে মাঝেই আসে। তার জীবনীমূলক একটি উপন্যাস পড়ে, তার ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম।"

বাবা: "সে তো ভালো কথা! কিন্তু সেটার সাথে এই ভোরবেলায় তার বাড়ি যাওয়ার কারণটা কি?"

ঐশীর চোখে জল ভরে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“কারণ আমি অভিকে ভালোবাসি, বাবা। আর সেও আমাকে ভালোবাসে। বেশ কয়েকদিন যাবৎ আমরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছি। আজ আমরা দুজনেই ভোরে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে দুজনেই একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।”

মুহূর্তে ঘর ভারী হয়ে গেল। যেন সময় থমকে দাঁড়াল।

ঐশীর বাবা (অবাক বিস্ময়ে): "কিন্তু, সে তো তোর থেকে বয়সে অনেক বড়ো। আর ওরা বিখ্যাত ব্যক্তি, ওদের লাইফ স্টাইল আর আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের লাইফ স্টাইলে অনেক ফারাক। ওদেরকে কেউ কিছু বলতে পারবে না, কিন্তু আমাদের পাড়া প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়-স্বজন এরা কি বলবে!"

ঐশীর মা: "তুমি একটু শান্ত হও। এখন এসব না ভেবে অফিস যাও, ফিরে এসব কথা ভাবা যাবে।"

ঠিক তখনই দরজা থেকে বেরিয়ে এলো অর্পিতা, বড় বোন। "কি হয়েছে?"

বাবা: "তোমার বোনকে বোঝাও, যা করছে ঠিক করছে না।"

অর্পিতা: "কি হয়েছে রে বুনু!!"

ঐশী: "দি-ভাই, আমি আর সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছি। অভির মা'ও আমাকে অভির স্ত্রী করতে চায় বলে সম্মতি দিয়েছেন।"

অর্পিতা (সাবধানে):
“বাবা, তুমি এখন একটু শান্ত হয়ে অফিস যাও, ফিরে এসে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা যাবে এটা নিয়ে। কিন্তু ঐশী হুট করে এসব বলেনি বাবা। আমি বেশ কয়েকদিন ধরে ওর মধ্যে পরিবর্তন টের পাচ্ছিলাম।”

বাবা (কর্কশ স্বরে):
“চুপ কর অপা (অর্পিতার ডাক নাম)! পড়াশোনায় মন দে। নিজের মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে ভাব, এবার তোর ফাইনাল। প্রেমের ভূত তোমাদের রক্তে কে ঢুকিয়ে দিল?”

অর্পিতা মাথা নিচু করল। কিন্তু চোখে বোনের জন্য এক ধরণের উদ্বেগ ঝরে পড়ছিল। ইতিমধ্যে ছোট বোন ইশা এসে সব চুপচাপ শুনছিলো। সব শুনে মুখে সরল হাসি।

ঈশা:
“আমি কিন্তু মেজদি-কে সমর্থন করি। প্রেমের তো বয়স হয় না। বই-এ পড়েছি, সিনেমাতেও দেখি… বয়স যতই হোক, ভালোবাসাই আসল।”

বাবা (রাগে গর্জে উঠলেন):
“চুপ কর ঈশা! ছোট ছোটোর মতো থাক। সিনেমা আর বইয়ের কল্পনা দিয়ে সংসার চলে না। বাস্তবের কাদা খুব নোংরা, তুই বুঝবি না।”

ঈশা চুপ করে গেল, কিন্তু ঐশীর হাত শক্ত করে ধরে থাকল।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠে চাপা আবেগ—
“শোনো, আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঐশীর চোখের দৃঢ়তা আমি দেখেছি। হয়তো সমাজ কিছু বলবে, কিন্তু মেয়ে যদি সত্যিই সুখ খুঁজে পায়—আমরা কি তার পথে কাঁটা হবো?”

বাবা (চোখ রাঙিয়ে):
“তুমি-ও এসব সমর্থন করছো? অভিনব গুপ্ত—ওর নাম শুনেই লোক হাসবে! বয়সে দ্বিগুণ প্রায়, সমাজে আমরা মুখ দেখাবো কীভাবে?”

ঐশী হঠাৎ বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ল। দু’হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
“বাবা, আমি জানি তুমি রাগ করছো। কিন্তু আমি অভিকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। তুমি যদি না চাও, আমি কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। কিন্তু একটা সুযোগ দাও আমাদের—তুমি নিজে অভির সঙ্গে একবার কথা বলে দেখো।”

বাবা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের চোখে। সেখানে ভয় নেই, আছে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

ঘর নিস্তব্ধ। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ কানে বাজছে। বাবা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, বারান্দার দিকে হেঁটে গেলেন। মুখ ঘুরিয়ে শুধু বললেন—
“এই কথার উত্তর এখন দিতে পারছি না। আমার একটু সময় চাই।”

মা চোখ নামালেন। অর্পিতা চুপচাপ বোনের পাশে দাঁড়াল। ঈশা ফিসফিস করে বলল— “দি, ভয় পাস না… আমি তোকে সমর্থন করব।”

ঐশী ভেজা চোখে বাবার পেছনের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ধ্বনিত হলো—
“বাবা কি কখনও বুঝবে আমাকে?”

চলবে....

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...