রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ২৫: অভির বাড়ির আলো–আঁধার

অভির বাড়িতে তখন সকাল গড়াচ্ছে। বারান্দা ভরে উঠেছে পাখির ডাক, ভেতরে মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, আর ছোট ভাই অরিজ তাড়াহুড়ো করছে অফিস যাওয়ার জন্য।

অভি নিজের ঘরে বসে ভাবছে, ঐশী তার বাবাকে সব জানিয়েছে—এই খবর তাকে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ফেলেছে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন অভির বাবা। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাশিটা যেন ক্রমেই বাড়ছে। শরীরে সেই জোর আর নেই, তবুও মুখে সেই চেনা দৃঢ়তা।

বাবা (গম্ভীর স্বরে):
“অভি, তোর মা বলছিলো তুই নাকি কলেজের এক মেয়েকে বিয়ে করার কথা ভেবেছিস। সত্যি?”

অভি চমকে তাকাল, কিন্তু শান্ত গলায় বলল—
“হ্যাঁ বাবা। ওর নাম ঐশী। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় এক সেমিনারে। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।”

অভির মা রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামলাতে চাইলেন।
“শোনো, আবেগে কিছু বোলো না। আগে ওকে একটু সময় দাও।”

কিন্তু বাবা থেমে থাকলেন না।
“ভালোবাসা মন্দ নয়। কিন্তু ও তো বয়সে তোর থেকে অনেক ছোট।”

অভি মৃদু গলায় বললো - "হ্যাঁ বাবা।"

বাবা চিন্তিত গলায় - "আমরা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু মেয়েটার বাবা-মা কি রাজি হবেন? সামাজিক বিষয়টাও তো ভেবে দেখা উচিৎ।"

অভি দৃঢ় গলায় বলল—
“সমাজ কি আজ পর্যন্ত আমার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে?” একটু থেমে - "আচ্ছা বাবা তুমিই বলো, আমাদের খারাপ সময়ে কেউ কি কখনও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে? - বাড়ায়নি তো, তাহলে আমরা কেনো সমাজের কথা ভাববো!! আর তাছাড়া আমরা তো কোনও বেআইনি কাজ করিনি বা করছিও না। হ্যাঁ মানছি যে আমাদের দুজনের বয়সের ফারাক আছে, কিন্তু ও আর আমি দুজনেই কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক। তাই দুজনেরই জীবন নিজেদের মতো করে ভাবার অধিকার আছে।"

ঘর নিস্তব্ধ। বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“কথাটা ভুল বলিসনি। তবে আমার ভয় একটাই—তুই যেন ভুল পথে না হাঁটিস।”

অভির ভাই এসব কানেই তোলেনি অফিসে যাওয়ার তাড়ায় বা এখনও জানেই না। বেরোবার আগে অরিজের কন্ঠস্বর - "আমি বেরোচ্ছি।"

মা - "আয় বাবা। অফিস ছুটির পর ডাইরেক্ট বাড়ি আসবি, কোথাও আড্ডা মারতে বসিস না।"

অরিজ: "আরে না মা, সারাদিন কাজের পর আর ভালো লাগে নাকি, আমি বাড়িতেই আসবো।"

ঠিক তখনই সদর দরজায় কলিং বেল বাজলো। অরিজ দরজা খুলেই দেখলো ঐশী দাঁড়িয়ে মুখোমুখি অরিজ। ঐশী ঢুকবে, অরিজ বেরোবে। ঐশীর চোখ ভেজা, কিন্তু মুখে সাহসী অভিব্যক্তি।

অরিজ সামনা সামনি এরকম একজন সুন্দরী মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে গেলো, বললো - "আ..আপনি কাকে চান?"

মা: "কে এসেছে?"

অরিজ: কৌতূহলী চোখে "দেখো তো উনি বোধহয় কাউকে খুজছেন!" বলে অরিজ বেরিয়ে গেলো পাশ দিয়ে।

ঐশী ভেতরে ঢুকে এলো - "আমি কাকিমা।"

মা: "এসো মা, এসো এসো।"

ইন্দ্রনাথ বাবুর (অভির বাবা) দিকে তাকিয়ে মৈত্রেয়ী দেবী (অভির মা) একটু হাসিমুখ করে বললেন - "এই যে তোমার অভির পছন্দ, দেখো তো কেমন পছন্দ তোমার ছেলের?"

সে বাবার সামনে হাত জোড় করে পায়ে দুহাত দিয়ে প্রণাম করে বলল—
“প্রণাম কাকু। আমি জানি আপনি চিন্তিত। কিন্তু আমি অভিকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আপনি যদি একবার আমাকে সুযোগ দেন, আমি প্রমাণ করব—অভির পাশে থাকার মতো শক্তি আমার আছে।”

অভির বাবা মেয়েটির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রাখলেন। সেখানে ভয় নেই, আছে দৃঢ়তা।

মা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন—
“দেখো তো, মেয়েটার চোখে কি নিষ্ঠা নেই?”

বাবা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বারান্দার দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুধু বললেন—
“সময় লাগবে। এখনই কিছু বলছি না। তবে তোমাদের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেব।”

অভির বুক হালকা হলো। ঐশী মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখে ভরসার জল নেমে এলো।

ঘরের ভেতর আলো–আঁধারের মাঝেই নতুন এক লড়াইয়ের সূচনা হলো।

চলবে…

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...