মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল।

অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ—

“অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।”

— সৃজিতা।

অভি এবার বিরক্ত হলো। সে ঠিক করল আর কোনো উত্তর দেবে না। ফোনটা সাইলেন্টে রেখে হেঁটে চলে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই রাস্তায় একটা কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ির ভেতর থেকে সৃজিতা। মুখে কৃত্রিম হাসি—

“অভি, প্লিজ… পাঁচ মিনিট সময় দাও।”

অভি থমকে দাঁড়াল এবং বিস্মিত হয়ে -

"তুমি কীকরে জানলে আমি আজ এই কলেজে এসেছি? স্পাই লাগিয়েছো আমার পেছনে?"

"একজন বিখ্যাত ব্যক্তির সম্মন্ধে জানার জন্য কোনও স্পাই লাগেনা অভি!" - সৃজিতা এক নিশ্বাসে বলে গেলো।

অভি একটু বিরক্ত হয়ে -

“তুমি কি আর বুঝতে পারছো না, আমি এসব চাই না?”

সৃজিতা গাড়ি থেকে নেমে এলো। চারপাশে লোকজন, তাই অভি খুব রুক্ষও হতে পারল না।

সৃজিতা নিচু গলায় শ্লেষাত্মক হাসিতে বলল—

“তোমার নতুন পছন্দের মানুষ যদি জেনে যায় সেই ভয় পাচ্ছো? আমি নিজে কিছু বলবো না, তবে অন্য কোনও ভাবে যদি জেনে যায়, তবে আমাকে দোষ দিওনা কিন্তু।"

একটু থেমে সৃজিতা আবার বলতে শুরু করলো - "তবে আমার কাছে তুমি আজও সেই অভি। আমার কাছে তোমার স্মৃতি মরেনি। জানো, আমার জীবনটা বাইরে থেকে যত সুন্দর দেখাক না কেন, ভেতরে আমি একেবারে একা। দিব্যেন্দু আমাকে সময় দেয় না, শুধু ব্যবসা আর পার্টি। এমনকি… আমাদের সম্পর্কও অনেকদিন ভেঙে গেছে। আমি শুধু মেয়েটার জন্য সংসার টেনে নিচ্ছি।”

অভি শান্ত স্বরে বলল—

“এটা শুনে আমি কি করতে পারি, তোমার সংসার, তোমার পরিবার তুমি কিভাবে ট্যাকল করবে, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। আর বারবার আমার কাছে এসে তুমি ঠিক কি চাইছো বলোতো? আবার আমাকে জড়িয়ে নিজের শূন্যতা ভরতে?”

সৃজিতা তার হাত ধরতে গেলো—

“আমি শুধু চাই তুমি মাঝে মাঝে আমার সাথে থেকো। পুরোনো বন্ধু হিসেবে হলেও। আমার শূন্য জীবনে একটু আলো আসুক। আমি জানি, তোমার একজন নতুন সখী এসেছে জীবনে, তাকে নিয়ে আমার কোনও আগ্রহও নেই। আর আমি সেটা ছিনিয়ে নিতেও চাই না। তবে আমি কথা দিচ্ছি, আমার আর তোমার সম্পর্ক আর মাঝে মাঝে মিট করার কথা ওই মেয়েটা আমার কাছ থেকে অন্তত জানবে না।”

অভি এবার হাতটা সরিয়ে নিল।

“না, তুমি ভুল ভাবছো। আমি ঐশীর কাছে আজ স্বচ্ছ, তার কাছে কিছু লুকোনো নেই। তুমি যদি সত্যিই ভেঙে পড়ো, সেটা তোমার নিজের সিদ্ধান্তের ফল। আমার কাছে এখন শুধু ঐশী।”

সৃজিতা হালকা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল—

“অভি… তুমি কি ভুলে গেছো, আমি একদিন তোমাকে আমার সমস্ত স্বপ্নের ভেতর রেখেছিলাম? তুমি যদি সত্যিই আমাকে একেবারেই ভুলে যাও, তবে আমি ভেঙে পড়ব।”

অভি রাগ চেপে বলল—

“তুমি বুঝছো না সৃজিতা, এভাবে কাছে আসতে চাইলে তুমি শুধু আমার সম্পর্কই নয়, তোমার নিজের সংসারও ভেঙে ফেলবে। তোমার স্বামী, তোমার মেয়ে—তাদের কথা একবারও ভাবছো না? আর এভাবে কারোর মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পর ভবিষ্যতে তাকে বা তার মনকে জোরজবরদস্তি ফেরত পাওয়া যায়না।”

অভি এবার দ্রুত হেঁটে নিজের গাড়িতে বসে বেরিয়ে গেলো।

সৃজিতা দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার পাশে, ঠোঁটে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি। নিজের মনে ফিসফিস করে বলল—

“ঐশী… তুমি ভেবেছো আমাকে হারিয়ে জিতে গেছো? ভুল করছো মেয়ে। অভি আমার ছিলো, এখনও আমি তাকে আমার ইচ্ছামতো টানতে পারি। যেকোনোভাবে।”

চলবে....

পর্ব ৩৩: আশ্রয়ের আলো

রবিবার রাত আটটা।
অভি ক্লান্ত মুখে বাড়ি ফিরল। দরজায় কলিং বেল বাজালো। 
মা এসে দরজা খুলে দিলো আর বললো - ঐশী এখনও আছে। ঘরে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
অভি ধীরে জুতো খুলে রাখতে রাখতে বললো - "ও এখনও বাড়ি যায়নি? রাত আটটা বাজে,  কাল তো ওর কলেজ আছে!"
 
ঠিক তখনই ঐশীও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। উৎকণ্ঠা মিশ্রিত কন্ঠে বললো - "হ্যাঁ, আমি বাড়ি যাবো। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।"

মা বললো - "ঠিক আছে, অভি তুই ওকে ওর বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসবি।"

অভি - "ঠিক আছে মা।"

ঐশী - "আরে নাহ্ কাকিমা, আমি একাই চলে যেতে পারবো, ও অনেক ক্লান্ত হয়ে এসেছে, একটু রেস্ট নিক।"

মা - "নাহ্ মা, তুমি পাকামি কোরো না, আমি যেটা বলেছি, সেটাই ও করবে। আমি তোমাকে একলা ছাড়তে পারবো না। ও যতই ক্লান্ত হোক, এটা এখন ওর ডিউটি, নিজের হবু স্ত্রীয়ের দায়িত্ব নেওয়া।"

ঐশীকে তার হবু শাশুড়ী যে এত আপন ভেবে নিয়েছে, সেটা ভেবে ঐশী আরও নিশ্চিন্ত হলো।

মা তার নিজের ঘরে যেতে যেতে অভিকে বললো -
"ফ্রেশ হয়ে ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে ঐশীকে দিয়ে আসবি।"

অভি -
"হ্যাঁ মা।"

এদিকে ঐশীর চোখে একরাশ উৎকণ্ঠা। অভির হাত ধরে অভির ঘরে যেতে যেতে -
“এত দেরি হলো, সব ঠিক আছে তো?”

অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বললো -
“হ্যাঁ… সব ঠিক আছে।"

ঐশী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সে শুধু অভির পিছন পিছন অভির ঘরে টেনে বসিয়ে দিলো। রান্নাঘর থেকে গরম দুধ এনে তার সামনে ধরল।
“এই নাও, আগে এটা খাও। তারপর যা বলতে ইচ্ছে করে বলবে।”

অভি তাকিয়ে রইল ঐশীর দিকে।
মনে হলো—এই মেয়েটার চোখের ভেতরেই তার সমস্ত নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।

দুধটা এক চুমুক খেলো অভি।
তারপর আস্তে আস্তে সব খুলে বলল—কফি হাউসে সৃজিতার সঙ্গে দেখা, পুরোনো স্মৃতির কথা, কেমন করে সে আবার টানতে চাইছিলো অভিকে পুরোনো ঘূর্ণিতে।

সব শুনে ঐশী একটুও বিচলিত হলো না।
শুধু মৃদু হেসে বলল—
“ও চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তুমি আজ যেটা, সেটা তো আর অকারণে হয়নি। তবে তুমি জানো তো অভি, তোমার জায়গাটা কোথায়?”

অভি বিস্মিত চোখে তাকাল।
“কোথায়?”

ঐশী হাত বাড়িয়ে অভির মাথা টেনে নিলো তার বুকে।
“এখানে।”

অভির বুকের ভেতর চাপা কাঁপনটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল।
সে নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
“ঐশী, তুমি না থাকলে আমি আজ সত্যিই ভেসে যেতাম। পুরোনো স্মৃতি বড় কষ্ট দেয়। কিন্তু তুমি আমার ভেতরে নতুন এক আলো জ্বেলে দিয়েছো।”

ঐশী চুপচাপ ওর কপালে হাত রাখল।
“তাহলে আর ভাবনা কিসের? তোমার অতীত তোমাকে কাঁদাতে পারে, কিন্তু বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আমি তোমার জন্য সাজিয়ে রাখবো। তুমি শুধু আমার ওপর ভরসা রেখো।”

অভি চোখ বুজে ঐশীর হাত শক্ত করে ধরল।
মনে হলো—এটাই তার একমাত্র সত্যিকারের আশ্রয়।

অভি মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিলো, ওর ঐশীকে বললো - "এবার চলো তোমায় ছেড়ে দিয়ে আসি।"

ঐশী - "কি দরকার ছিলো গো!"

অভি - "না, আমি তোমাকে আর কোনও কিছুতেই হারাতে চাইনা ঐশী; রাত হচ্ছে, আর মা স্ট্রিক্টলি বলে দিয়েছে, এরপর তোমার আর কোনও আপত্তি থাকতে পারেনা।"

ঐশী - "ঠিকাছে বাবাহ্, আমি আর মানা করবো না তোমায়।"

অভি নিজের গাড়ি বার করলো, সামনের সিটে পাশেই বসলো ঐশী। সিট বেল্ট পড়ে নিলো দুজনে। তারপর মিনিট দশেকের নীরবতা। ইতিমধ্যে ঐশীর বাড়ি পৌঁছে গেলো। ঐশী নেমেই দেখলো আশেপাশে কেউ দেখছে কিনা, তারপর অভির দিকে তাকিয়ে বললো - "টাটা," তারপর মৃদু হেসে মৃদু কন্ঠে, "কাল আসবো শ্বশুরবাড়ি কলেজ ফেরত!!"

অভিও হেসে ফেললো আর হ্যাঁ সূচক সম্বোধন করে গাড়ি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

অভি বাড়ি ফিরে, বাকিদের সাথে রাতের খাওয়ার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।

বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে ধীরে ধীরে। কিন্তু ভেতরে, অভির জীবনে যেন নতুন এক নিশ্চিন্ত আলো জ্বলে উঠেছে।

চলবে…

সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ৩২: অনিশ্চিত পথের শুরু

রবিবার সকাল।
আকাশটা যেন কেমন ধূসর। হালকা কুয়াশার মতো ছায়া পড়েছে গলিপথে। অভির মনে হচ্ছে—আজকের দিনটা অন্যরকম।

গতরাতে ঐশীর বুকে মাথা রেখে সব খুলে বলার পর অনেকটা হালকা লাগছে। কিন্তু তবুও মনে একটা চাপা কাঁপুনি আছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে আবার ভেসে উঠল সেই মেসেজ—
“অভি, কাল দুপুরে কফি হাউসে দেখা করো। প্লিজ।”

অভি কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

মা অভির দিকে তাকিয়ে বললেন —
“অভি, আজ রবিবার। সকাল সকাল চা খেয়ে নে, তারপর তোর কাজ নিয়ে ভাবিস।”

অভি চুপচাপ মাথা নাড়ল।

দুপুর নাগাদ ঐশী এল। হাতে কয়েকটা বই।
“এগুলো কাল লাইব্রেরী থেকে এনেছি, তোমার কাজে লাগবে ভাবলাম।”

অভি তার হাত থেকে বইগুলো নিয়ে টেবিলে রাখলো। তারপর একটু দ্বিধা করে বলল—
“ঐশী, আজ হয়তো আমাকে কফি হাউসে যেতে হবে।”

ঐশী শান্ত মুখে অভির দিকে তাকালো।
“হ্যাঁ, যাও। তবে মনে রেখো—তুমি যেখানেই যাও না কেন, তোমার ঘর এখানে, আমার কাছে।”

অভি মৃদু হাসল।
ঐশীর এই নির্ভরতা তাকে নতুন সাহস দিলো।

অভি দুপুরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুটি প্রকাশনীর মালিকের বাড়িতে গিয়ে তাদের সাথে কিছু হালকা কথাবার্তা সেরে কফি হাউস যাবে ঠিক করলো। সেই মতো বেরিয়ে গেলো।

ঐশী সেখানে সন্ধ্যে পর্যন্ত কাটিয়ে অভির সাহিত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এগিয়ে রেখে বাড়ি ফিরবে ঠিক করলো।

এদিকে রবিবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল - কফি হাউস।
সন্ধের আলো নেমে আসছে। বাইরে ব্যস্ততা, ভেতরে গ্লাসের টুংটাং শব্দ, টেবিল জুড়ে চেনা অচেনা মুখ।

অভি ঢুকতেই দেখতে পেল—এক কোণে বসে আছে সৃজিতা।
মাথার উপরে কালো ফ্রেমের সানগ্লাস, খোলা পরিপাটি চুল কাঁধ পর্যন্ত, পরনে বেশ রঙিন শাড়ি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক।
কিন্তু চাহনিতে সেই পুরোনো অস্থিরতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত চাপা টান।

অভি ধীরে গিয়ে চেয়ারে বসল। সৃজিতার ঠোঁটে সাজানো একরকম কৃত্রিম হাসি। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। সৃজিতা নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সৃজিতা শুরু করলো - "সেই দুপুর থেকে বসে আছি। বেশ বুঝতে পারছি টানটা আর আগের মতো নেই। অবশ্য তুমি তো এখন সেলিব্রিটি। প্রেমের সেই দিনগুলোতে তুমি যেমন আমার জন্য অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করতে, আজ মনে হলো তার প্রতিশোধ নিলে, আমিও অনুভব করলাম, তোমাকে অতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য তোমার কিরকম লাগতো। আমি সত্যিই দুঃখিত সেই দিনগুলোর জন্য।"

অভি - "ঠিক সেটা নাহ্, আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো।"

সৃজিতা - "স্বাভাবিক আমি এখন তোমার কাছে গুরুত্বহীনই বটে।"

ইতিমধ্যে ওয়েটার এলো অর্ডার নিতে। সৃজিতা অভির দিকে তাকিয়ে - "তুমি কি সেই পুরনো রোবাস্টা, নাকি সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়েছে?"

অভি - "একই, আমি সময়ের সাথে নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারিনি।"

কথাটা সৃজিতার মনে খুব বিধলো, কিন্তু কিছু বললো না।

সৃজিতা (ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে) - "একটা ক্যাপুচিনো রোবাস্টা আর একটা কোল্ড কফি।" 

সৃজিতা অবশেষে বলল—
“অভি, তুমি একদম বদলে গেছো। আগে তোমাকে এভাবে দেখিনি। তোমার চোখে এখন আত্মবিশ্বাস, তোমার মুখে সেই হারানো দীপ্তি ফিরে এসেছে। এখন সবাই তোমার নাম করছে। জানো, আমি… আমি গর্বিত যে তোমাকে কোনোদিন আমার বলতে পেরেছিলাম।”

অবশেষে কফি এসে গেল।

অভি কফিতে এক চুমুক দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল—
“ধন্যবাদ। কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ এই ডাক কেন?”

সৃজিতা একটু কেঁপে উঠল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
“আমি ভুল করেছি অভি। আমি ভেবেছিলাম টাকাপয়সা, আড়ম্বরেই সুখ লুকিয়ে আছে। কিন্তু বুঝতে পারিনি… তোমাকে হারিয়ে আমি আসলে নিজেকেই শূন্য করে ফেলেছি।”

অভি চোখ নামিয়ে কফির কাপে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
“যখন কিছুই ছিল না আমার, তখন তুমি আমার পাশে থাকতে পারলে না। আজ আমি যখন একটু উঠে দাঁড়িয়েছি, তখন তুমি আবার ফিরে আসতে চাইছো। এটা কি ন্যায়সঙ্গত?”

সৃজিতার চোখ ভিজে এল।
“আমি জানি, তোমাকে আর পাবো না। তবুও এই একবার বলতে চেয়েছিলাম—আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”

অভি শান্ত গলায় উত্তর দিল—
“সৃজিতা, তুমি তোমার সংসার যেরকম চেয়েছিলে সেরকম পেয়েছো, এমনকি সবকিছু উপভোগ করেছো। এখন সব সুযোগ সুবিধা হাতের কাছে পাচ্ছো। তোমার কিসের অভাব আজ? তোমার স্বামী, তোমার মেয়ে—ওরাই তোমার সত্যি। আমি এখন তোমার অতীত। আমার কাছে আজ অন্য এক আলো এসেছে, যার নাম ঐশী। আর তুমি আমায় ছুঁড়ে ফেলে না দিলে, আজও হয়তো তোমারই থাকতাম। আমাকে ছেড়ে যাকে বিয়ে করেছিলে তার সাথেও তো অনেকটা সময় তুমি চুটিয়ে প্রেম করেছো, তারপর বিয়ে করেছো। তখন কি একবারও আমার কথা মনে পড়েছিলো? কি করছি, কিভাবে দিন কাটাচ্ছি! এটা তো মিথ্যা নয়।”

সৃজিতা নীরব হয়ে রইল।
চারপাশের কোলাহলের মাঝেও যেন এক নিস্তব্ধতা ভেসে উঠল। তারপর সেই কথা খুব চালাকির সাথে এড়িয়ে বললো
“মনে আছে অভি, সেদিন তোমার কাছে ক্লাস করতে গিয়েছিলাম, তুমি বলেছিলে—‘তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি।’ তখন আমি উচ্চমাধ্যমিকের দোরগোড়ায়। আমি এখনও তোমার চোখে তাকালে সেই কথাগুলো শুনতে পাই। বলো, সত্যিই কি একেবারেই কিছু বাকি নেই তোমার ভেতরে?”

অভি এবার চোখ তুলে তাকাল। ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে।
“তুমি এখন কেন এসব বলছো? যখন আমার জীবনটা ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছিল, তোমার ভালোবাসা হারিয়ে আমি তখন অথৈ জলে, জীবনের চারিদিক অন্ধকার, আমি তখন দিশেহারা, কোনদিকে গেলে সঠিক পথ পাবো ভেবে পাচ্ছিনা; তখন তো তুমি চলে গেলে দিব্যেন্দু দা'র গাড়ি-বাড়ি, টাকার কাছে। তখন তো তোমার এসব ভালোবাসা মনে পড়েনি। যখন আমার কিছুই ছিল না, তখন তো তোমার চোখে আমার কোনো মূল্য ছিল না।”

সৃজিতা একটু থেমে গলাটা নরম করল এবং পুরানো প্রেমের স্মৃতিকে আরও একটু উস্কে দেওয়ার চেষ্টায় মগ্ন হলো।
“অভি, তুমি কি ভুলে গেছো সেই দিনগুলো? যখন মাধ্যমিক পাশ করে সদ্য ইলেভেনে উঠলাম, তখন আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে গিয়ে বলেছিলাম, "স্যার আমি আপনার জন্যই এত ভালো রেজাল্ট করেছি, মানছি আমি আপনার থেকে অনেক ছোট, তবুও এখন কি আমি আপনার মন পাওয়ার যোগ্য হতে পেরেছি?" কিছুক্ষণ থেমে সৃজিতা কফিতে একটু চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো - "তখন কিন্তু তুমিই হাঁটু গেড়ে বসে প্রথম আমাকে একটা লাল গোলাপ আর ক্যাটবেরি দিয়েছিলে, আর হাত ধরে বলেছিলে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি! মনে পড়ে সে কথা?" তখন যদি তুমি না বলতে, আমি কিন্তু আর এগোতাম না; আবার বৃষ্টির দিনে একদিন তুমি বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলে, সদ্য কলেজে ওঠা আমি তখন কলেজ থেকে ভিজতে ভিজতে ফিরছিলাম, তুমি এগিয়ে এসে ছাতাটা ধরে আমাকে ভিজতে দাওনি! আমি কি ভুলতে পেরেছি সেসব?”

অভি চুপচাপ। চোখ নামিয়ে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে আছে। স্মৃতির ধাক্কা তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন ধরালেও মুখ শক্ত রেখেছে।

সৃজিতা কিছুটা অস্থির হয়ে উঠে বলল—
“আমি ভুল করেছি, অভি। আমি ভেবেছিলাম টাকা, ঐশ্বর্য, নিরাপত্তাতেই সুখ লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই সংসারে আমি শুধু শূন্যতা পেয়েছি। দিব্যেন্দু দিন রাত ব্যস্ত থাকে, মেয়েটাকে বড় করছি একাই। অথচ তুমি… তুমি আজ আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করলে—মানুষ নিজের শক্তিতে কেমন করে উচ্চতায় উঠতে পারে। আর আমি? আমি শুধু তোমাকে হারিয়ে নিজের সর্বনাশ করেছি।”

একটু থেমে, কণ্ঠ ভিজিয়ে আবার বলল—
“অভি, আমি জানি আমি তোমাকে আর পাবো না। তবুও… আজ আমি আবার বলতে চাই, আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। যদি একটুও তোমার মনে আমার পুরোনো অভির অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে তুমি সেটা অনুভব করবে।”

অভির বুকের ভেতর যেন পুরোনো প্রেমের হাওয়া এক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সৃজিতার সেই কাঁচা বয়সের দিনগুলো — মনে পড়ছে ক্লাস এইট থেকে তার কাছে পড়তে আসা এক ছাত্রী কিভাবে তার প্রেমিকা হয়ে উঠলো, মনে পড়ে গেলো ক্লাস টেনে ওঠার পরই সৃজিতার তাকে প্রথম প্রেমপত্র দেওয়ার কথা। বয়সে অনেক ছোট বলে সেদিন খুব ধমক দিয়েছিলো সৃজিতাকে। সেদিন, ও খুব কেঁদেছিলো। তারপর ধীরে ধীরে কবে যে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসা, মনে পড়ে না আর। ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় গঙ্গার ধারে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্ন বলা, বৃষ্টির ভেজা বিকেল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে আবার টেনে নিতে চাইছে তাকে পুরোনো ঘূর্ণিতে।

কিন্তু অভি গভীর শ্বাস নিয়ে গলাটা শক্ত করল।
“না সৃজিতা। তুমি ভুল করছো। আজ আমি অন্য মানুষ। হ্যাঁ, অতীত ভুলিনি, কিন্তু আজকের আমি সেই অতীতের অভির কাছে ফিরে যেতে পারি না। আমার আজকের জীবনে ঐশী আছে—সে আমাকে যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে আগলে রেখেছে, তুমি সেটা কখনও করোনি।”

সৃজিতা কাঁপা গলায় বলল—
“তাহলে তুমি সত্যিই আর একটুও আমায় অনুভব করো না? তুমি কি একদমই ভুলে গেলে আমাকে?”

অভি শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল—
“ভুলিনি। কিন্তু সেই স্মৃতি এখন শুধুই অতীত। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আছে ঐশীর হাত ধরে। তোমার কাছে আছে তোমার সাজানো সংসার - দিব্যেন্দু দা, তোমার মেয়ে, তোমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি - আভিজাত্যে ভরপুর। সমাজে দিব্যেন্দু দা'র স্ত্রী হিসাবে তোমার একটা বিশাল সন্মান আছে। দয়া করে তোমার নিজের পৃথিবীটা ভেঙো না।”

সৃজিতার চোখে জল এসে গেল। ঠোঁট কাঁপছে।
সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু অভি আর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। সৃজিতা বুঝলো অভিকে আর তাদের পুরানো প্রেমের কথা বলে গলানো সম্ভব না।

অভির চোখের গভীরে অদ্ভুত এক অভিমান, কিন্তু গলায় দৃঢ়তা—
“বিদায় রুমা।”

অভি বেরিয়ে গেল কফি হাউস থেকে। বাইরে হাওয়ায় ভেসে আসছিল ভিড়ের শব্দ, গাড়ির হর্ন। কিন্তু তার ভেতরে যেন এক নতুন শান্তি।

অন্যদিকে, সৃজিতা চুপচাপ টেবিলে বসে রইল, চোখের সামনে ধোঁয়া ওঠা অভির কফির কাপ—সৃজিতা চুপচাপ কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। যেন তার নিজের শূন্য জীবনের প্রতিচ্ছবি।

চলবে…

পর্ব ৩১: অতীতের ছায়া

শনিবার সকাল।
অভি একটু দেরি করে, সকাল ৯টার পর ঘুম থেকে উঠল। জানলার পাশে বসে রাতের অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সেই বার্তাটা যেন বারবার চোখে পড়ছে—

“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

এক অজানা টান আর দ্বিধার মাঝে পড়ে অভি।
অন্যদিকে, তার ভেতরের নতুন আশ্রয়—ঐশী—গতরাতে কেমন করে বুক ভরে তাকে আগলে রাখল, সেই স্মৃতি তাকে শক্তিও দিচ্ছে, আবার দ্বন্দ্বও বাড়াচ্ছে।

এমন সময় পাশের ঘর থেকে মায়ের ডাক -
“অভি, উঠেছিস?”

অভি ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে - 
"বলো মা"

মা - "জলখাবার আর চা রেখেছি টেবিলে, দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে খেয়ে নে।"

অভি - "ঠিকাছে মা। একটু বাথরুম হয়ে আসি, চা'টা আরেকবার গরম করে দিও প্লীজ মা।"

মা - "আচ্ছা বাবা।"

কিছুক্ষণ পর অভি ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো। জলখাবার খেতে খেতে মা চা গরম করে এনে দিলো।
তারপর হেসে বললেন - "আজ তো শনিবার, তোর ভাইয়ের আজ হাফ, তাই বিকেল বিকেল আসবে আর বলেছে চপ, সিঙ্গারা নিয়ে আসবে; বলে গেছে, দাদাকে বলে রেখো বৌদিকে বলে রাখতে, সে যেনো বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসে।"

অভি বললো - "এখন কিভাবে বলবো? সে তো এখন কলেজে ক্লাস করছে, ওর বৌদিকে ও তো গতকাল নিজেই বলতে পারতো, ঠিক আছে দাঁড়াও আমি একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।"

খাওয়ার খেয়ে অভি স্নান সেরে একটা কাজে বেরোলো আর মাকে বলে গেলো যে সে এসে লাঞ্চ করবে।

দুটো নাগাদ অভি এসে দুপুরের প্রাতঃরাশ সেরে ঘরে গিয়ে নিজের সাহিত্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ দরজায় শব্দ হল।
হাতে একটা কাগজের প্যাকেট নিয়ে ঢুকল অরিজ। অফিস থেকে ফেরার পথে গরম গরম সিঙাড়া-চপ নিয়ে এসেছে।

অরিজ (হাসতে হাসতে):
“দাদা, তুই তো রাতজাগা কবি। আজকাল তোদের ঘরে গিয়ে ঢুকলেই দেখি হাওয়ার মতো এক খুশির গন্ধ। কে জানে কিসের গন্ধ!”

অভি (হালকা মুচকি হেসে):
“তোর এসব ফাজলামো কম হয় না রে।”

ঠিক তখনই ঐশী এল। কলেজ আর টিউশন করে একবারে ফিরেছে, আজ তারও হাফ ডে ছিলো। এমনিতেই ঐশী বেশ সুন্দরী। কিন্তু ক্লান্ত শরীরেও ঐশীকে বেশ উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিলো যেন প্রেম তার জীবনকে আরও তরতাজা করে দিয়েছে। আর হবু শ্বশুরবাড়ির সবাই তাকে ভীষণ আপন করে নিয়েছে। যদিও নিজের বাড়িতে তার বাবা একটু চিন্তান্বিত।

অরিজ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে প্যাকেট বাড়িয়ে দিল—
“এই যে বৌদি! তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছো। গরম গরম সিঙ্গাড়া আর চপ নিয়ে এসেছি সবার জন্য। চপ সিঙ্গারা আর তোমার হাতের দারুণ চা এই বিকেলের আসর জমিয়ে দেবে।”

মৈত্রেয়ী দেবী - "আরে দাঁড়া ওকে একটু জিরিয়ে নিতে দে, দেখছিস তো মেয়েটা কলেজ থেকে সদ্য ক্লান্ত হয়ে এসেছে।"

ঐশী (হেসে): "না কাকিমা আমি ঠিক আছি। আর ভবিষ্যতে এরকম প্রাণবন্ত একটা শ্বশুরবাড়ির বউ হতে পারবো এই মধুর অনুভূতিই আমার সব ক্লান্তি দুর করে দেয়, তাই তো কলেজ ছুটির পর বাড়ি না গিয়ে আমি এখানে ছুটে আসি।"
অরিজের দিকে তাকিয়ে - "আমাকে দাও প্যাকেটটা, আমি ওটা পরিবেশন করে দি, তোমরা খাও, আমি চা বানিয়ে আনছি।"

অরিজ (চোখ টিপে):
“ওটা তো হবু বৌদির হাতে প্রথম সিঙাড়া খাওয়ার সৌভাগ্য আমার হবে, তাই না?”

ঐশী স্নেহের চোখে অরিজের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে রান্নাঘরে চলে গেলো।

অল্প পরেই চা এল। অরিজ প্রথম চুমুক দিতেই বলে উঠল—
“উফ বৌদি, তোমার চা তো আসলেই দারুণ!”

মা মৃদু হেসে বললেন—
“তুই কিন্তু বৌদির হাতে চা খাওয়ার নেশায় পড়ে যাবি।”

ঘরটা কিছুক্ষণ আগেও নিস্তব্ধতার ভারে আচ্ছন্ন ছিল। এখন যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠল হাসি-ঠাট্টায়।

সবাই যখন মজা করছে, হাসছে, তখন অভির ভেতরটা যেন বারবার কেঁপে উঠছে। সে জানে, অতীতের সঙ্গে এই দেখা—তার বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিতে পারে।

ঐশী তখন চুপচাপ অভির দিকে তাকাল। অভি চোখ নামিয়ে নিল। তার মনে তখনও ঘুরছে সেই বার্তা—
রুমার ডাক।

ঐশী একটু পরে পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল—
“কি হয়েছে অভি? তোমার মুখটা এত গম্ভীর কেন?”

অভি শুধু হালকা হাসল।
কিন্তু চোখের গভীরে সেই অস্থিরতা লুকিয়ে রাখা গেল না।

কিছুক্ষণ আড্ডার পর মা, বাবা আর অরিজ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
ঘরে রইল কেবল অভি আর ঐশী।

ঐশী ধীরে বলল—
“অভি, তুমি সত্যিই কিছু লুকাচ্ছো না তো আমার থেকে?”

অভি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল আর চুপ করে ঐশীর চোখের দিকে তাকাল। মনে হল, ঝড়ের ভেতরেও ঐশীর উপস্থিতিই তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

অভি একটু সাহস করে বললো “ঐশী… তোমাকে আগেও বলেছি, কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো থেকে আমি পালাতে চাই। কিন্তু সেগুলো আমাকেই তাড়া করে ফিরছে।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে -
"জানো, গতকাল আমার প্রথম প্রেম সৃজিতা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছে দেখা করার জন্য। আগেও এড়িয়ে গেছি, আর এখন তো তুমি আমার জীবনের আলো। আমি তাই ভাবছি ইগনোর করবো নাকি গিয়ে শুনবো কি বলতে চায়। আমি তো তাকে ছেড়েছিলাম নাহ্, সে নিজেই কোনও কারণ ছাড়া আমার বিশ্বাস, ভরসা আর প্রেম একসময় ছুঁড়ে ফেলে অন্য একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিলো। তাহলে সে এখন আবার কি চায়?"

ঐশী তার হাত ধরে দৃঢ় স্বরে বলল -
"তুমি গিয়ে দেখো সে কি বলতে চায়। এর জন্য আমি তোমাকে কখনও ছেড়ে যাবো না। তুমি নিশ্চিন্তে যাও অভি।"

ঐশী কাছে এসে দুই হাত দিয়ে অভিকে বুকে জড়িয়ে ধরলো আর মাথায় হাত দিয়ে আদর করতে করতে চোখ বুজে শারীরিকভাবে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো এবং আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো - "আমি তোমারই থাকবো কথা দিচ্ছি বেবী।"

অভি ঐশীকে তার অতীতের ছায়ার সবকিছু বলার পর যেনো মনে থেকে পুরোপুরি হালকা হয়ে গেলো। দুজনেই দুজনের কাছে এখন স্বচ্ছ। আর কোনও লুকানোর কিছু রইলো না।

চলবে…

পর্ব ৩০: নতুন আলাপন

রাত আটটা বেজে গেছে, দুজনে এখনও খুব কাছাকাছি। কিন্তু দুজনেই সেই ম্যাসেজটা নিয়ে দোলাচলে, কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না।

সম্বিৎ ফিরলো দরজার টোকায় - "আসবো"

ঐশী চমকে অভির থেকে কিছুটা সরে গেলো, অভি দরজায় তাকিয়ে দেখলো ভাই।
অভি - "বাবা, তুই আবার কবে এতো ভদ্র হলি রে, দরজায় টোকা মেরে পারমিশন নিচ্ছিস, তাও নিজের দাদার ঘরে!!

ঘরে ঢুকলো এক লম্বা চেহারার, হাসিখুশি যুবক অরিজ।
অরিজ (ঐশীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে মুচকি হেসে) - "তা তো নিতেই হবে। এখন থেকেই তার প্র্যাকটিস করছি!!"

অভি - "বাচালতা ছেড়ে কি বলতে এসেছিস বল!!"

অরিজ - "আমি তোর সাথে দেখা করতে আসিনি রে দাদা, আমি আমার হবু বৌদির সাথে আলাপ করতে এসেছি।" তারপর অভির দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে - "তুই তো আর আলাপ করালি নাহ্!! মায়ের কাছ থেকে শুনে আলাপ করতে এলাম!"
এবার ঐশীর দিকে তাকিয়ে - “এই যে বৌদি প্রার্থী! মায়ের কাছে শুনলাম দেবীর মতো রান্নাঘরে রাজত্ব করছেন। সবাইকে চা বানিয়ে খাইয়েছেন, তো আমি কি চা পাবো না?”

ঘরটা কিছুক্ষণ আগেও একটা দমবন্ধকর আশঙ্কায় ভরে উঠছিলো, অরিজ আসার পরে বাড়িটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

ঐশী (মুচকি হেসে) - "নিশ্চয়ই আমার হবু দেবর, এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি। কাকিমা বলছিলেন, তোমার বউদি হয়ে যাবো—তাহলে চা না খাইয়ে কি ছাড়া যায়? তবে আমি কিন্তু তোমার থেকে অনেক ছোট - তোমার মা বলেছেন। তাই তুমি আমাকে আপনি আজ্ঞে না করে তুমি ডাকলেই আমি খুশি হবো আর নাম ধরেই ডেকো।"

তক্ষুনি মায়ের প্রবেশ। মৈত্রেয়ী দেবী কিছুটা বকুনির ভঙ্গিতে
"না মা, বড়ো হলে কি হবে, সম্পর্কে তো ছোটই হবে। আর ওর দাদা ওর থেকে অনেক বড়ো, তাই তার হবু স্ত্রীকে তার ভাই বৌদি বলেই ডাকবে। এর যেনো অন্যথা না হয়। ওর বাবা এবং আমি দুজনেই এতো আধুনিকতা চাই না।"

অরিজ খিলখিল করে হেসে উঠল—
“দেখো মা, আমি কিন্তু এসে থেকেই আমার হবু বৌদিকে বৌদি ডাকছি। কে জানে, পরেরবার আসতে দেরি করলে আবার বদলে যাবে নাকি!”

মৈত্রেয়ী দেবী পাশে দাঁড়িয়ে বললেন—
“তোর এই ফাজলামো যাবে না অরিজ। তুই শুধু মুখে মুখে খেলাস, আসল সময়ে ঐশীর মতো কেউ যদি পাশে না থাকে, তোরা মানুষ হবি কেমন করে?”

অরিজ মাকে হেসে জড়িয়ে ধরল—
“মা, তুমি তো জানো, আমি কেবল হাসি-ঠাট্টা করতে ভালোবাসি। কিন্তু দাদার জন্য এমন বৌদি যদি পাই, তাহলে তো আমার জীবনও জমে যাবে!”

ঘরভর্তি হাসির রোল উঠল।
অভি দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মনে মনে খুশি হল। অনেকদিন পরে তার ঘরে এমন আনন্দময় পরিবেশ।

ঐশী (লাজুক হেসে) - "দাঁড়াও অরিজ, আমি তোমার জন্য এক্ষুনি চা বানিয়ে আনছি।"

অরিজ - "বৌদি, আমি কিন্তু দাদার মতো নিরামিষ চা খাই না! দুধ, চিনি দিয়ে করে দেবে।"

ঐশী ঠিক আছে বলে রান্না ঘরে চলে গেলো।

কিছুক্ষণ পর ঐশী চা এনে অরিজকে দিলো।

অরিজ (চায়ে চুমুক দিয়ে) - "উফ বৌদি কি চা বানিয়েছো।"

ঐশী (একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে) - "কেনো ভালো হয়নি?"

অরিজ - "মা, আমাদের বাড়ির একজন চা স্পেশালিস্ট এসে গেছে। এবার থেকে প্রতিদিন বৌদি সন্ধ্যাবেলায় আমায় চা খাওয়াবে।"

মা - "হ্যাঁ, ওটাই বাকি আছে। তোর বৌদির আর কলেজ নেই, পড়া নেই, আর অন্য কোনও কাজ নেই, তোর জন্য সন্ধ্যাবেলায় এসে নাকি বাড়িতে চা বানিয়ে খাওয়াবে! শখ কতো!"

অরিজ - "সেটা তো দাদার উপর ডিপেন্ড করছে। কবে দাদা পাকাপাকি ভাবে হবু বৌদিকে আমার নিজের বৌদি করবে।"

কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে আড্ডায় বসল। ছোটখাটো খুনসুটি, গল্প, স্মৃতিচারণা—মনে হচ্ছিল সংসারে আবার আলো ফিরে এসেছে।

কিন্তু রাত বাড়তে থাকল। একে একে সবাই ঘর ছেড়ে গেল। অরিজ চলে গেল নিজের ঘরে, অভির বাবা টিভি দেখতে বসলেন, মা রান্নাঘরে কাজ শেষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ঘরে রইল শুধু অভি আর ঐশী।
টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলটা তখনও স্ক্রিনে আলো ছড়াচ্ছে। ঐশীর দৃষ্টি বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছিল।

অভি চুপচাপ মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।
সেই মেসেজটা এখনও অক্ষত—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

অভির চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
ঐশী অভির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
“অভি, কিছু লুকাচ্ছো না তো আমার থেকে?”

অভি গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
“ঐশী… কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো থেকে আমি পালাতে চাই। কিন্তু সেগুলো আমাকেই তাড়া করে ফিরছে।”

অভির চোখে ভেসে উঠল দ্বন্দ্ব, মনের ভেতর ঢেউ।
ঐশী চেয়েছিল আজকের সন্ধ্যেটা হোক শুধু দুজনার—
কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের সেই বার্তা তাদের নিঃশব্দ ভালোবাসার মাঝেই এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিল।

ঐশী ধীরে তার হাত ধরে বলল—
“তুমি যদি পালাও, আমি তোমাকে আবার টেনে আনব। তুমি একা নও অভি, আমি আছি। আর আমার থেকে তোমাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না”

ঐশী অভিকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। দুজনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরলো।
ঐশী (মৃদু কন্ঠে) - "এই আমি তোমাকে আমার বুকে আঁকড়ে ধরলাম। দেখি কে আমার থেকে আমার অভিকে ছিনিয়ে নেয়।"

রাত প্রায় নটা -
অভি (আবেগ কন্ঠে) - "রাত হচ্ছে, তোমাকে তো ফিরতে হবে।"

ঐশী (খুব হালকা স্বরে) - "হ্যাঁ গো, কাল আবার কলেজ আছে। আমি চাই তুমি আমাকে খুব শিগগির এই বাড়িতে নিয়ে আসো। যাতে তোমাকে ছেড়ে আর যেতে না হয়। আমার তোমাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না।"

অভি (মৃদু কন্ঠে) - "আমিও তাই চাই। আমিও তোমাকে আর ছেড়ে থাকতে পারছি না।"

দুজনে আলিঙ্গনমুক্ত হলো। ঐশী বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে বাড়ির সবাইকে বলে বেরিয়ে গেলো।

এদিকে অভি সৃজিতার সেই ম্যাসেজটা নিয়ে চিন্তামগ্ন হয় পড়লো।

চলবে…

পর্ব ২৯: প্রেমের টান

রাত যত গাঢ় হয়, সৃজিতার অস্থিরতা ততই বাড়তে থাকে।
ঘরে শুয়ে থাকা মেয়েটার ঘুমন্ত মুখ দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।
“ওর জন্যই তো আমি লড়ছি… তবুও কেন মনে হচ্ছে আমার ভেতরে এত শূন্যতা?”

মোবাইল হাতে নিয়ে আবারও খুলল সেই খবর—অভিনব আর পাশের মেয়েটির ছবিটা।
মেয়েটির হাসি, ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত আর অভির আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি—সবকিছু যেন সৃজিতাকে তাড়া করছে।

হঠাৎ করেই বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
“যখন অভির কিছুই ছিল না, তখন আমি তাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম।
আজ যখন অভি আলোয় ভরে উঠেছে, তখন কেন আমি আবার তার দিকে টান অনুভব করছি? এটা কি ন্যায়সঙ্গত?”

পরেরদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে—
অভিনব তখন নিজের ঘরে খাতা খুলে বসে আছে। আর ঐশী অভির বাড়িতে....

অভির মা ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যে দিতে গেছেন। বাবা বারান্দায় বসে রাস্তা দেখছেন।
ঐশী নিজের উদ্যোগে নিজের বাড়ি মনে করে সবার জন্য চা বানাচ্ছে রান্নাঘরে।

কিছুক্ষণ পর মৈত্রেয়ী দেবী ঠাকুর ঘর থেকে ডাইনিং রুমে এসে দেখলেন ঐশী সবার জন্য চা বানিয়ে টেবিলে রাখছে।
বললেন - "একি মা, তুমি আবার এসব করতে গেছো কেনো? আমি তো সন্ধ্যা দিয়ে এসে তোমাদের জন্য চা করতাম!!"

ঐশী - "তাতে কি হয়েছে কাকিমা, আমি তো এখন নিজেকে এই বাড়িরই একজন মনে করি। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমাকে এখন হয়তো বাড়ি চলে যেতে হয়, কিন্তু আপনাদের বিশ্বাস, ভরসা আর আশীর্বাদ থাকলে আমি তো ভবিষ্যতে আপনাদেরই একজন হবো।"

অভির মা (আবেগতাড়িত হয়ে) - "আচ্ছা ঠিক আছে মা, তুমি যেটা ভালো মনে করো, কোরো নিজের মনে করে, আমি আর কিছু বলবো না।"
কিছুক্ষণ থেমে - "আচ্ছা মা, তোমার সাথে তো বাড়ির আরেকজনের আলাপ হওয়া বাকি।"

ঐশী - "কে কাকিমা?"

মা - "আমার ছোট ছেলে, তোমার অভির ছোট ভাই অরিজের সাথে।"

ঐশী - "হ্যাঁ কাকিমা, গতকাল সকালে আমি বাড়িতে ঢোকার সময় দেখেছি ওকে!"

মা - "হ্যাঁ, ও আসবে সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ। তুমি ততক্ষণ থাকলে দেখা হয়ে যাবে। তবে আমরা তোমার ব্যাপারে ওকে কিছু জানাইনি। আসলে বলবো।" তারপর মৃদু হেসে - "ভেবেছি সামনাসামনি ওর হবু বৌদির সাথে আলাপ করিয়ে দেবো।"

ঐশী (লাজুক হেসে) মাথা ঝুঁকিয়ে সবার জন্য চা পরিবেশন করতে করতে বললো - "ঠিক আছে।"

মা - "তুমি তো এখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার, তাহলে তোমার বয়স বছর কুড়ি বা একুশ হবে! কি তাইতো?"

ঐশী - "হ্যাঁ, কাকিমা।"

মা - তাহলে তোমার হবু দেওর তোমার থেকে প্রায় ন'বছরের বড়ো। ও ওই চাকরিটাই যা ঠিকঠাক করে, এছাড়া বাচ্চা বাচ্চা ভাবটা রয়েই গেছে, তোমাদের মতো পরিপক্কতার খুব অভাব। আর ভীষণ ফক্কর।" কিছুক্ষণ থেমে - "আমার ছেলে বলে বলছি না,  এমনিতে আমার ছোট ছেলে খুব ভালো, লোকের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, সবাই ওকে ভালোবাসে, মনে কোনও রকম কোনো প্যাঁচ নেই। মনে যেটা আসে বলে দেয়, কিন্তু যাকে বলছে, সে কিছু ভাবতে পারে ওর কথায়, সেসব মাথায় থাকেনা।"

ঐশী - "কাকিকা আমি কাকুকে গিয়ে চা দিয়ে আসছি।"

মা (একটু খুশি মনে) - "ঠিক আছে মা।"

ঐশী চা নিয়ে অভির বাবাকে বারান্দায় গিয়ে দিয়ে বললো - "কাকু চা। আমি বানিয়েছি, খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে?"

অভির বাবা চা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে ঐশীর দিকে তাকিয়ে বললেন - "তুমি কি বাড়িতেও চা বানাও?"

ঐশী - "বাড়িতে থাকলে আমিই বানাই।" কিছুক্ষণ চুপ করে, "এটা কেমন হয়েছে কাকু?"

অভির বাবা - "বেশ ভালো।"

ঐশী (নিশ্চিন্তের মৃদু হাসিতে) - "ধন্যবাদ কাকু" বলে ডাইনিং রুমে ফিরে এসে মৈত্রেয়ী দেবী (অভির মা)-কে চা বাড়িয়ে দিলো।

মৈত্রেয়ী দেবী চা নিয়ে ইন্দ্রনাথ বাবুর কাছে যাওয়ার সময় ঐশীকে বললেন - "যাও মা, অভির চা-টা নিয়ে অভির কাছে যাও, আমি তোমার কাকুর কাছে যাচ্ছি।"

অভির ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু বন্ধ করে চুপচাপ চেয়ার টেনে তার পাশে বসল।

“অভি…”
অভি মাথা তুলল।
“চা নাও।" কিছুক্ষণ থেমে "তুমি জানো, তোমার জীবনে আমার কত বড় ভূমিকা সেটা আমি কাউকে দেখাতে চাই না। শুধু চাই, তুমি যেন আর একা না থাকো।”

অভির ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল, চায়ে এক চুমুক দিয়ে - বাহ্ চা তো দারুণ করো তুমি!"

ঐশী খুশি হয়ে একটু নাটকীয়ভাবে - "থ্যাঙ্ক ইউ ডার্লিং।"

দুজনে চা খাওয়া সম্পূর্ণ করে, একটু সাহিত্য নিয়ে আলাপচারিতা করলো।

তারপর অভি -
“ঐশী, তুমিই তো আজ মানসিকভাবে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়েছো। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।”

ঐশীর চোখে তখন এক নিবিড় আলো।
সে জানে—এই মুহূর্তে অভি তাকে নিজের ভেতর ঢুকতে দিয়েছে। দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে - তারা যেনো দুজনেই কোন এক অজানা কাল্পনিক প্রেমালাপে ডুব দিয়েছে।

সন্ধ্যা নেমেছে - দুজনে আরও কাছাকাছি। অভি নিজের চেয়ারে বসে টেবিলে নিজের লেখা দেখছে। ঐশী এসে পাশে দাঁড়িয়ে অভির লেখা দেখে মুগ্ধ চোখে লেখা দেখছে আর অভির দিকে তাকাচ্ছে।

অভি - "ঐশী তোমাকে আর ছেড়ে থাকতে পারছি না"

ঐশী আরও কাছে এসে দাঁড়িয়ে অভিকে নিজের বুকে টেনে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো। মাথা নিচু করে অভির দিকে তাকিয়ে, অভির চুলে নিজের কোমল আঙুল বোলাতে বোলাতে বললো - "আমিও না গো, অভি! তুমি শুধু আমার, তোমার উপর শুধু আমারই অধিকার। আমি তোমাকে এভাবেই আগলে রাখবো, তুমি দেখো অভি।"

কিন্তু ঠিক তখনই—
অভির ফোনে এক অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ ভেসে উঠল।

অভি ঐশীর বহুবন্ধ থেকে মাথা সড়িয়ে দেখলো হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ। রাত প্রায় আটটা। শব্দগুলো ছোট, অথচ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

অভির বুক ধক করে উঠল। ঐশী অভির মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে আন্দাজ করতে পারলো যে অভিনব ম্যাসেজটা দেখে একটু চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছে, কিন্তু ঐশী তেমন কোনও কৌতূহল দেখালো না, তবে জিজ্ঞেস করল - "কিছু কি সমস্যা হয়েছে?"

অভি কথাটা গোপন রেখেই বললো - "তেমন কিছু না।"

তবে ঐশী মনে মনে ভাবল—
“মনেহচ্ছে ভাগ্য সত্যিই আমাদের প্রেমের কিছু পরীক্ষা নিতে চলেছে।”

নিস্তব্ধতায়, দুই ভিন্ন ঠিকানায় দুটো মানুষ—অভি আর সৃজিতা— অস্থিরতার ভেতর হারিয়ে গেল।

চলবে…

পর্ব ২৮: দ্বন্দ্বের আঁচ

অভিনবের জীবনে পরিবর্তন স্পষ্ট।
কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখন শুধু ওর লেখা পড়ে না, ওকে নিয়ে আলোচনা করে, ওর ফ্যানস অনেক। ছোট ছোট অনুষ্ঠান, সাহিত্যসভা—সবখানেই অভির ডাক পড়ছে।

ঐশী নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কখনো প্রুফ দেখে দিচ্ছে, কখনো অনুষ্ঠানের আয়োজন সামলাচ্ছে। তার উপস্থিতিতে অভির ক্লান্তি কমে যায়। একদিন অনুষ্ঠানের পর ঐশী ধীরে বলেছিল—
“অভি, তুমি শুধু লেখক নও, তুমি অনেকের স্বপ্ন। আর আমি চাই, আমি তোমার শক্তি হয়ে থাকি।”

অভি শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিল, মনে মনে ভেবেছিল—
“যখন সব হারিয়েছিলাম, তখন পাশে কেউ ছিল না। আর আজ যখন উঠে দাঁড়াচ্ছি, তখন ঐশী আছে। এর উত্তর আমি কীভাবে দেব?”

অন্যদিকে, সৃজিতা নিজের সংসারে এক অদ্ভুত অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। দিব্যেন্দুর সাফল্য আছে, কিন্তু তার সঙ্গে সম্পর্ক যেন দূরে সরে গেছে। প্রায়শই রাতের খাবার একা খেতে বসতে হয়। শাশুড়ি অসন্তোষ প্রকাশ করেন -
“মেয়েমানুষদের সংসার আঁকড়ে ধরতে হয় রুমা, খামখেয়ালিপনা মানায় না।”

সৃজিতা জানে, বাইরের চোখে সে ভাগ্যবতী নারী। অথচ ভেতরে শূন্যতা যেন প্রতিদিন বাড়ছে। সেই শূন্যতাকেই বাড়িয়ে দিল এক সন্ধ্যায় পড়া খবর—
অভিনবের নতুন বই প্রকাশের অনুষ্ঠান নিয়ে প্রথম সারির দৈনিকের বড় রিপোর্ট। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাসিমুখে অভি, পাশেই দাঁড়িয়ে একটি অত্যন্ত সুন্দরী মেয়ে। মনে হচ্ছে যেন খুব ঘনিষ্ঠ।
শিরোনাম: “সাহিত্যের নবপ্রজন্মের শক্তি—অভিনব গুপ্ত।”

সৃজিতার বুক ধক করে উঠল।
“পাশের মেয়েটি আবার কে?”
অজান্তেই ঈর্ষার আগুন ছড়িয়ে পড়ল ভেতরে।

রাতে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল— “আমি কি ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলাম? না কি আজও অভির জন্য আমার ভেতরে কিছু বেঁচে আছে?”

মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। দিব্যেন্দু তখনও ফেরেনি।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সৃজিতা নিজের ভেতরে চাপা এক সিদ্ধান্তের আঁচ টের পেল।

চলবে…

রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ২৭: অচেনা সংসার

সময় গড়িয়েছে অনেক দূর।
সৃজিতার জীবনে এখন বাহ্যিক পূর্ণতার অভাব নেই—শ্বশুরবাড়ির ঐশ্বর্য, দিব্যেন্দুর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা, মেয়ের হাসিমাখা মুখ—সবই আছে। তবু অদ্ভুত এক শূন্যতা তার চারপাশে ছায়া ফেলে রেখেছে।

দিব্যেন্দু প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরে। কখনো কাজের ব্যস্ততা, কখনো ক্লায়েন্ট মিটিং। সংসারে তার অবদান অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। রুমা (সৃজিতা) কখনো মনে মনে ভাবে—
“আমার চারপাশে এত মানুষ, এত কোলাহল… তবুও আমি একা কেন?”

মেয়েকে এখন থেকেই একটি প্রি-স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট মজার ছড়া আধো আধো উচ্চারণে 0মুখস্থ করে মাকে শোনায়। সৃজিতা হাসিমুখে শোনে, কিন্তু মাঝে মাঝে বুকের ভেতর চাপা দীর্ঘশ্বাস জেগে ওঠে।

একদিন সকালের কাগজ হাতে নিয়ে বসে থাকতে গিয়ে চোখে পড়ল বড় হেডলাইন—
“অভিনব গুপ্ত: বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের মুখ এবার New India Foundation Fellowship Award এর জন্য নমিনেটেড হয়েছে।”
সাথে ছাপা আছে অভির ছবি—আত্মবিশ্বাসী হাসি, গলায় নতুন প্রজন্মের তুমুল প্রশংসা।

সৃজিতার হাত কেঁপে উঠল।
এই কি সেই অভি, যাকে একসময় নিজের হাত থেকে ছেড়ে দিয়েছিল?
যে অভিকে সে একসময় বলেছিল— “তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি”—
সেই অভি আজ ভবিষ্যৎকেই জয় করে নিয়েছে।

সন্ধ্যায় শাশুড়ি বলছিলেন,
“দিব্যেন্দু তো খুব ব্যস্ত, রুমা। সংসারের সব দায়িত্ব তোমার কাঁধে এসে পড়ছে। তবে মেয়েটাকে ঠিক মতো মানুষ করাই তোমার আসল কাজ।”

সৃজিতা চুপচাপ মাথা নাড়ল। বাইরে গৃহবধূ, ভেতরে অস্থির নারী। অভির নাম এখন তার কাছে শুধু অতীতের নয়, বর্তমানেরও প্রতিধ্বনি।

রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে সৃজিতা মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি সত্যিই ভুল করেছিলাম? ঐশ্বর্য বেছে নিয়ে কি আমি আমার সত্যিকারের সুখ হারিয়েছি?”

উত্তর মেলেনি।
কেবল জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশে যেন হারানো ভালোবাসার ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছিল।

চলবে…

পর্ব ২৬: বাবার নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব

ঐশীর চলে যাওয়ার পর ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। অভি চুপচাপ বারান্দার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মা রান্নাঘরে ফিরে গেলেও হাতের কাজ থেমে গেছে বারবার, মনে মনে শুধু ঐশীর কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।

ইন্দ্রনাথবাবু চেয়ার টেনে বসে আছেন। হাতে সাদা রুমাল, মাঝেমধ্যে কাশির ঝাঁকুনিতে শরীর কেঁপে উঠছে। কিন্তু চোখের ভেতরে এক অদ্ভুত টান—সিদ্ধান্তহীনতা।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
“মৈত্রেয়ী, মেয়েটি খারাপ নয়। চোখেমুখে ভরসা আছে। তবে ভরসা কি সংসার টানার জন্য যথেষ্ট?”

মা শান্ত স্বরে জবাব দিলেন—
“তাহলে কি সমাজের ভয়েই আমরা ছেলের জীবন থামিয়ে রাখব? অভি যত কষ্ট করেছে, সেই কষ্ট কি আমরা ভুলে গেছি? আজ যদি ওর জীবনে একটু আলো আসে, তবে সেটা কেড়ে নেওয়া ঠিক হবে? আর সংসারের কথা বলছো, আমিও যখন এই সংসারে এসেছিলাম, তখন কি আমিও জানতাম যে এই সংসার প্রায় ৪০ বছর টানতে পারবো? সেই সময় আমার শ্বাশুড়ি আমায় শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়েছিলেন আর ঐশীর ক্ষেত্রেও আমি শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবো। তুমি চিন্তা কোরো না।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সমাজের কথা না ভেবেও কি থাকা যায়? আত্মীয়-স্বজন সবাই মুখে আঙুল তুলবে। আর ঐশীর বাবা-মা? তারা যদি অসম্মতি জানায়?”

অভি এতক্ষণ চুপ ছিল, এবার দৃঢ় গলায় বলল—
“বাবা, আমি জানি তুমি চিন্তিত। কিন্তু তোমাকে একটা প্রশ্ন করি—আমাদের খারাপ সময়ে, যখন তুমি অসুস্থ, আর সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, তখন আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের কেউ কি এসে বলেছিল, ‘আমরা আছি?' আজ তারা যদি আঙুল তোলে, আমি কাউকে অসন্মান না করেই বলছি—তাতে কিছু যায় আসে না।”

কথাটা শুনে ইন্দ্রনাথবাবু গম্ভীর হলেন। তাঁর চোখে এক মুহূর্তের জন্য অশ্রু চিকচিক করে উঠলো।

“তুই ঠিকই বলছিস, অভি। সমাজ কোনোদিন আমাদের দায় টানেনি। তবু… আমি চাই না তুই তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত নে। তোর জীবনটা অনেক বড়।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।

ঠিক তখনই বারান্দার জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো সকালের হালকা রোদ। মা চোখ তুলে তাকালেন।
“আলো ঢুকছে, বুঝলি? অন্ধকার চিরদিন থাকে না। হয়তো এই আলোই তোর জীবনে নতুন সূচনা আনবে।”

অভি চুপ করে মাথা নোয়াল। বাবার চোখে এবার একটু নরম ভাব।

বাইরে শ্যামবাজারের গলিতে তখন ভাঙা ছাদের উপর দিয়ে পায়রা উড়ে যাচ্ছিল। ভেতরে অভি বুঝলো—এ লড়াই শুধু প্রেমের নয়, এটা তার নিজের পরিবারকেও নতুন করে গড়ে তোলার লড়াই।

চলবে…

পর্ব ২৫: অভির বাড়ির আলো–আঁধার

অভির বাড়িতে তখন সকাল গড়াচ্ছে। বারান্দা ভরে উঠেছে পাখির ডাক, ভেতরে মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, আর ছোট ভাই অরিজ তাড়াহুড়ো করছে অফিস যাওয়ার জন্য।

অভি নিজের ঘরে বসে ভাবছে, ঐশী তার বাবাকে সব জানিয়েছে—এই খবর তাকে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ফেলেছে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন অভির বাবা। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাশিটা যেন ক্রমেই বাড়ছে। শরীরে সেই জোর আর নেই, তবুও মুখে সেই চেনা দৃঢ়তা।

বাবা (গম্ভীর স্বরে):
“অভি, তোর মা বলছিলো তুই নাকি কলেজের এক মেয়েকে বিয়ে করার কথা ভেবেছিস। সত্যি?”

অভি চমকে তাকাল, কিন্তু শান্ত গলায় বলল—
“হ্যাঁ বাবা। ওর নাম ঐশী। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় এক সেমিনারে। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।”

অভির মা রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামলাতে চাইলেন।
“শোনো, আবেগে কিছু বোলো না। আগে ওকে একটু সময় দাও।”

কিন্তু বাবা থেমে থাকলেন না।
“ভালোবাসা মন্দ নয়। কিন্তু ও তো বয়সে তোর থেকে অনেক ছোট।”

অভি মৃদু গলায় বললো - "হ্যাঁ বাবা।"

বাবা চিন্তিত গলায় - "আমরা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু মেয়েটার বাবা-মা কি রাজি হবেন? সামাজিক বিষয়টাও তো ভেবে দেখা উচিৎ।"

অভি দৃঢ় গলায় বলল—
“সমাজ কি আজ পর্যন্ত আমার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে?” একটু থেমে - "আচ্ছা বাবা তুমিই বলো, আমাদের খারাপ সময়ে কেউ কি কখনও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে? - বাড়ায়নি তো, তাহলে আমরা কেনো সমাজের কথা ভাববো!! আর তাছাড়া আমরা তো কোনও বেআইনি কাজ করিনি বা করছিও না। হ্যাঁ মানছি যে আমাদের দুজনের বয়সের ফারাক আছে, কিন্তু ও আর আমি দুজনেই কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক। তাই দুজনেরই জীবন নিজেদের মতো করে ভাবার অধিকার আছে।"

ঘর নিস্তব্ধ। বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“কথাটা ভুল বলিসনি। তবে আমার ভয় একটাই—তুই যেন ভুল পথে না হাঁটিস।”

অভির ভাই এসব কানেই তোলেনি অফিসে যাওয়ার তাড়ায় বা এখনও জানেই না। বেরোবার আগে অরিজের কন্ঠস্বর - "আমি বেরোচ্ছি।"

মা - "আয় বাবা। অফিস ছুটির পর ডাইরেক্ট বাড়ি আসবি, কোথাও আড্ডা মারতে বসিস না।"

অরিজ: "আরে না মা, সারাদিন কাজের পর আর ভালো লাগে নাকি, আমি বাড়িতেই আসবো।"

ঠিক তখনই সদর দরজায় কলিং বেল বাজলো। অরিজ দরজা খুলেই দেখলো ঐশী দাঁড়িয়ে মুখোমুখি অরিজ। ঐশী ঢুকবে, অরিজ বেরোবে। ঐশীর চোখ ভেজা, কিন্তু মুখে সাহসী অভিব্যক্তি।

অরিজ সামনা সামনি এরকম একজন সুন্দরী মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে গেলো, বললো - "আ..আপনি কাকে চান?"

মা: "কে এসেছে?"

অরিজ: কৌতূহলী চোখে "দেখো তো উনি বোধহয় কাউকে খুজছেন!" বলে অরিজ বেরিয়ে গেলো পাশ দিয়ে।

ঐশী ভেতরে ঢুকে এলো - "আমি কাকিমা।"

মা: "এসো মা, এসো এসো।"

ইন্দ্রনাথ বাবুর (অভির বাবা) দিকে তাকিয়ে মৈত্রেয়ী দেবী (অভির মা) একটু হাসিমুখ করে বললেন - "এই যে তোমার অভির পছন্দ, দেখো তো কেমন পছন্দ তোমার ছেলের?"

সে বাবার সামনে হাত জোড় করে পায়ে দুহাত দিয়ে প্রণাম করে বলল—
“প্রণাম কাকু। আমি জানি আপনি চিন্তিত। কিন্তু আমি অভিকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আপনি যদি একবার আমাকে সুযোগ দেন, আমি প্রমাণ করব—অভির পাশে থাকার মতো শক্তি আমার আছে।”

অভির বাবা মেয়েটির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রাখলেন। সেখানে ভয় নেই, আছে দৃঢ়তা।

মা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন—
“দেখো তো, মেয়েটার চোখে কি নিষ্ঠা নেই?”

বাবা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বারান্দার দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুধু বললেন—
“সময় লাগবে। এখনই কিছু বলছি না। তবে তোমাদের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেব।”

অভির বুক হালকা হলো। ঐশী মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখে ভরসার জল নেমে এলো।

ঘরের ভেতর আলো–আঁধারের মাঝেই নতুন এক লড়াইয়ের সূচনা হলো।

চলবে…

পর্ব ২৪: বাবার সামনে সত্য

সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়লেও ঐশীদের বাড়িতে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে এসেছে। ঐশী তাদের ডাইনিং রুমের এক কোণে চুপচাপ বসে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মা তখনো ঘরের একপাশে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর ঠোঁট যেন সিল করা। ঘরের ভেতর বাতাস যেন থমথমে।

ঠিক তখনই ঐশীর বাবা ঘুম থেকে উঠে এলেন এবং কোনও দিকে না তাকিয়ে সকালের সমস্ত দৈনন্দিন অভ্যাস সারতে লাগলেন। সবকিছু হয়ে গেলে অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে স্ত্রী'কে তার প্রাতঃরাশ দেওয়ার জন্য বলে ডাইনিং টেবিলে এসে দৈনন্দিন পত্রিকা নিয়ে বসলেন আর সাথে টিফিনটাও তার অফিসব্যাগে গুছিয়ে দিতে বললেন।

ঐশীর মা গম্ভীর মুখে ঋদ্ধিমান বাবুর (ঐশীর বাবা) সামনে প্রাতঃরাশ দিয়ে টিফিন ব্যাগে দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে টেবিলের আরেক প্রান্তে এসে বসলেন।

বাবা কাগজ পড়তে পড়তে (হালকা বিরক্ত স্বরে):
“আজকাল যে কি সব হচ্ছে, কাগজ খুললেই হেডলাইন শুধু ধর্ষণ, খুন, পরকীয়া এসব। ভালো কোনও খবর থাকেনা, ধুর!! তবে একটা খবর খুব ভালো লাগলো, একজন বাঙালি সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত New India Foundation Fellowship Award এর জন্য নমিনেটেড হয়েছে। এই অঞ্চলের ছেলে। খুব ট্যালেন্ট আছে বলতে হবে। যদিও আমি খুব একটা সাহিত্য চর্চা করার সময় পাইনা। তবুও আমাদের অঞ্চলের নাম তো উজ্জ্বল করছে।" বলে কাগজ পাশের চেয়ারে রেখে দিলেন।

বাবার মুখে 'অভিনব গুপ্ত' নামটা শুনেই ঐশীর বুকটা ধক করে উঠলো; ঐশী আর তার মা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো।

প্রাতঃরাশ খেতে খেতে - "কি ব্যাপার, আমি এতো সব কথা বলছি, অথচ দুজনেই এতো চুপচাপ!!"

তারপর ঐশীর দিকে তাকিয়ে কি ব্যাপার ঐশী মা, তুমি এত সকাল সকাল উঠে পড়েছো যে!!" খাওয়ার মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ থেমে "ওই কোনায় বসে আছো কেনো, দিদি(অর্পিতা) বা বোন(ঈশা) এর সাথে সাত সকালে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?" তারপর স্ত্রীয়ের দিকে তাকিয়ে "নাকি মা বকা দিয়েছে?"

ইন্দ্রানী দেবী (ঐশীর মা): হ্যাঁ, তুমি তো কেবল আমাকে ওদের বকতেই দেখো!"

এদিকে ঐশীর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। মায়ের চোখ তাঁর দিকে ছুটে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ঐশী ধীরে ধীরে দাঁড়াল।

ঐশী (কাঁপা গলায়):
“বাবা… একটা কথা বলতে চাই।”

বাবা (চশমার ফাঁক দিয়ে কড়া দৃষ্টি ছুঁড়ে):
“বল! কিন্তু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নয়।”

ঐশী গভীর শ্বাস নিল। গলার স্বর যেন আটকে যাচ্ছিল—
“আমি… আমি ভোরবেলা অভির বাড়ি গিয়েছিলাম।”

বাবা খানিকক্ষণ চুপ থেকে - "অভি আবার কে মা?"

ঐশী: "বাবা তুমি যার কথা কিছুক্ষণ আগে বলছিলে, অভিনব গুপ্ত।"

বাবা (বিস্ময়ে মেয়ের দিকে চেয়ে):
“কি বললি? অভিনব গুপ্তর বাড়ি? উনি তো একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, আর তুই ভোর ভোর ওর বাড়ি? কেন? তুই চিনিস তাকে? পরিচয় আছে?”

ঐশী: হ্যাঁ, আছে বাবা!! আমাদের কলেজে এক সেমিনারে এসেছিলো, আমি নিজে তার সাথে পরিচয় করি। মাঝে মাঝেই আসে। তার জীবনীমূলক একটি উপন্যাস পড়ে, তার ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম।"

বাবা: "সে তো ভালো কথা! কিন্তু সেটার সাথে এই ভোরবেলায় তার বাড়ি যাওয়ার কারণটা কি?"

ঐশীর চোখে জল ভরে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“কারণ আমি অভিকে ভালোবাসি, বাবা। আর সেও আমাকে ভালোবাসে। বেশ কয়েকদিন যাবৎ আমরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছি। আজ আমরা দুজনেই ভোরে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে দুজনেই একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।”

মুহূর্তে ঘর ভারী হয়ে গেল। যেন সময় থমকে দাঁড়াল।

ঐশীর বাবা (অবাক বিস্ময়ে): "কিন্তু, সে তো তোর থেকে বয়সে অনেক বড়ো। আর ওরা বিখ্যাত ব্যক্তি, ওদের লাইফ স্টাইল আর আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের লাইফ স্টাইলে অনেক ফারাক। ওদেরকে কেউ কিছু বলতে পারবে না, কিন্তু আমাদের পাড়া প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়-স্বজন এরা কি বলবে!"

ঐশীর মা: "তুমি একটু শান্ত হও। এখন এসব না ভেবে অফিস যাও, ফিরে এসব কথা ভাবা যাবে।"

ঠিক তখনই দরজা থেকে বেরিয়ে এলো অর্পিতা, বড় বোন। "কি হয়েছে?"

বাবা: "তোমার বোনকে বোঝাও, যা করছে ঠিক করছে না।"

অর্পিতা: "কি হয়েছে রে বুনু!!"

ঐশী: "দি-ভাই, আমি আর সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছি। অভির মা'ও আমাকে অভির স্ত্রী করতে চায় বলে সম্মতি দিয়েছেন।"

অর্পিতা (সাবধানে):
“বাবা, তুমি এখন একটু শান্ত হয়ে অফিস যাও, ফিরে এসে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা যাবে এটা নিয়ে। কিন্তু ঐশী হুট করে এসব বলেনি বাবা। আমি বেশ কয়েকদিন ধরে ওর মধ্যে পরিবর্তন টের পাচ্ছিলাম।”

বাবা (কর্কশ স্বরে):
“চুপ কর অপা (অর্পিতার ডাক নাম)! পড়াশোনায় মন দে। নিজের মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে ভাব, এবার তোর ফাইনাল। প্রেমের ভূত তোমাদের রক্তে কে ঢুকিয়ে দিল?”

অর্পিতা মাথা নিচু করল। কিন্তু চোখে বোনের জন্য এক ধরণের উদ্বেগ ঝরে পড়ছিল। ইতিমধ্যে ছোট বোন ইশা এসে সব চুপচাপ শুনছিলো। সব শুনে মুখে সরল হাসি।

ঈশা:
“আমি কিন্তু মেজদি-কে সমর্থন করি। প্রেমের তো বয়স হয় না। বই-এ পড়েছি, সিনেমাতেও দেখি… বয়স যতই হোক, ভালোবাসাই আসল।”

বাবা (রাগে গর্জে উঠলেন):
“চুপ কর ঈশা! ছোট ছোটোর মতো থাক। সিনেমা আর বইয়ের কল্পনা দিয়ে সংসার চলে না। বাস্তবের কাদা খুব নোংরা, তুই বুঝবি না।”

ঈশা চুপ করে গেল, কিন্তু ঐশীর হাত শক্ত করে ধরে থাকল।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠে চাপা আবেগ—
“শোনো, আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঐশীর চোখের দৃঢ়তা আমি দেখেছি। হয়তো সমাজ কিছু বলবে, কিন্তু মেয়ে যদি সত্যিই সুখ খুঁজে পায়—আমরা কি তার পথে কাঁটা হবো?”

বাবা (চোখ রাঙিয়ে):
“তুমি-ও এসব সমর্থন করছো? অভিনব গুপ্ত—ওর নাম শুনেই লোক হাসবে! বয়সে দ্বিগুণ প্রায়, সমাজে আমরা মুখ দেখাবো কীভাবে?”

ঐশী হঠাৎ বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ল। দু’হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
“বাবা, আমি জানি তুমি রাগ করছো। কিন্তু আমি অভিকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। তুমি যদি না চাও, আমি কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। কিন্তু একটা সুযোগ দাও আমাদের—তুমি নিজে অভির সঙ্গে একবার কথা বলে দেখো।”

বাবা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের চোখে। সেখানে ভয় নেই, আছে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

ঘর নিস্তব্ধ। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ কানে বাজছে। বাবা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, বারান্দার দিকে হেঁটে গেলেন। মুখ ঘুরিয়ে শুধু বললেন—
“এই কথার উত্তর এখন দিতে পারছি না। আমার একটু সময় চাই।”

মা চোখ নামালেন। অর্পিতা চুপচাপ বোনের পাশে দাঁড়াল। ঈশা ফিসফিস করে বলল— “দি, ভয় পাস না… আমি তোকে সমর্থন করব।”

ঐশী ভেজা চোখে বাবার পেছনের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ধ্বনিত হলো—
“বাবা কি কখনও বুঝবে আমাকে?”

চলবে....

পর্ব ২৩: সত্যের মুখোমুখি

এখন সকাল ছটা
অভির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় ঐশীর বুকের ভেতর হালকা ধুকপুকানি। সকাল হয়ে গেলেও দিনের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রাস্তায় লোক কম, নিজের পদশব্দও শোনা যাচ্ছে।

সে মনের ভেতর একদিকে স্বস্তি—অভির মা তাঁকে মেনে নিয়েছেন, আবার অন্যদিকে ভয়—নিজের মা–কে কীভাবে সব বলবে?

কাউকে না বলেই বেরিয়ে যাওয়াতে নিজেদের বাড়ির সদর দরজাও ভিতর থেকে খোলা ভেবে দরজা ঠেলে খুলতে গিয়ে ঐশী দেখলো, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। বুঝলো তার মা বন্ধ করেছে নিশ্চয়ই।

দুবার কলিং বেল বাজানোর মিনিট খানেক পর দরজা খুলে গেলো - সামনে তার মা।

মা: “ঐশীর দিকে চেয়ে - বলি এতো সকালে কোন রাজকার্য করে ফেরা হচ্ছে শুনি? আর দরজা খুলে রেখে চলে গেছিস, অন্তত আমাকে তো বলে বেরোতে পারতিস?"

ঐশী থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর যেন ধপাস করে শব্দ হলো। মা এগিয়ে এসে তাকালেন, মেয়ের চোখে অদ্ভুত দীপ্তি দেখে কিছুটা অবাক হলেন। মেয়েকে ঘরে ঢুকতে দিয়ে দরজা আবার আটকে দিলেন। ঐশীর পিছন পিছন যেতে যেতে -

মা (সন্দেহ নিয়ে): “তা বলি রাজকার্য করতে কখন বেরোনো হয়েছিলো?”

ঐশী ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে দ্বন্দ্ব—বলবে, না লুকোবে?

সত্য স্বীকার
অবশেষে ধীরে ধীরে কাঁপা গলায় বলল— “মা… আমি অভির বাড়ি গিয়েছিলাম।”

তৎক্ষনাৎ মা - "কে অভি?"

ঐশী - "মা, অভি মানে বিখ্যাত সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত।"

মায়ের চোখ বড় হয়ে গেল। মা (কঠোর স্বরে): “অভির বাড়ি? তোমার থেকে কতো বড়ো তিনি, তুমি তাকে নাম ধরে সম্বোধন করছো!! এই শিক্ষা দিয়েছি আমরা তোমাকে? তাও এতো সকালে? কেন? কি এতো প্রয়োজন ছিলো, যে কাউকে কিছু না জানিয়ে এতো ভোরে তার বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লো?”

ঐশী চোখ নামিয়ে নিল। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলল— “কারণ আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারছি না মা। আমি অভিকে ভালোবাসি - মানে আমরা দুজনেই দুজনকে খুব ভালোবাসি। আজ অভির মায়ের সামনে সব স্বীকার করেছি।”

মায়ের প্রতিক্রিয়া
কিছুক্ষণ ঘর নিস্তব্ধ। শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে বিস্ময়, দুশ্চিন্তা আর এক ধরনের অজানা ভয়।

মা (গম্ভীর গলায়): “ঐশী, তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কী কথা বলছো? অভিনব গুপ্ত একজন কত বড়ো বিখ্যাত ব্যক্তি, আর সবথেকে আসল কথা হলো তোমার থেকে উনি অনেকটা বড়ো… লোকের চোখে কীভাবে দেখাবে? তুমি এখনও কলেজে পড়ছো।”
ঐশীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে মায়ের হাত ধরে বলল— “আমি সব জানি মা। বয়সের ফারাক আছে, লোকে কথা বলবে। কিন্তু আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। ও-ই আমার ভরসা, আমার ঘর।”

মায়ের নীরবতা
মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মা (আবেগ চেপে): “তুমি ছোট্ট থেকে যেটা চেয়েছো আমি সব পূর্ণ করেছি। কিন্তু এই ব্যাপারটা… এটা খুব সহজ নয় মা। সমাজ, লোকজন, বাবার রাগ—সবই ভাবতে হবে।”

ঐশী ভিজে চোখে ফিসফিস করে বলল— “আমি শুধু তোমার আশীর্বাদ চাই মা। তোমরা পাশে থাকলেই সব সামলে নেব।”
মা নীরবে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। তাঁর চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন মেয়ের দৃঢ়তায় একরাশ গর্বও।

চলবে....

পর্ব ২২: প্রথম আলাপ

ভোরের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। অভি আর ঐশী জানালার পাশে বসে নিঃশব্দে চা খাচ্ছিল। দু’জনের চোখে লাজুক হাসি, মনে নীরব উত্তেজনা।

হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
একটি পরিচিত কণ্ঠ—

অভির মা (বাইরে থেকে):
“অভি, ঘুম ভাঙল নাকি? ভোর হয়ে গেল তো।”

অভি চমকে উঠল। ঐশী কাপে হাত রেখেই স্থির হয়ে গেল। দু’জনের চোখে এক মুহূর্তে একই প্রশ্ন—এখন কী হবে?

অভি আস্তে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি ভয় পেও না, ঐশী। আজকের সকালটাই হোক আমাদের সত্যের শুরু।”

সে দরজা খুলল।

দরজা খুলতেই মা দাঁড়িয়ে। হাতে পুজোর থালা, চোখে হালকা অবাক দৃষ্টি। তিনি ঘরে ঢুকেই ঐশীকে দেখলেন। জানালার পাশে বসে থাকা অপরিচিতা মেয়েটিকে দেখে মুহূর্তে চুপ করে গেলেন।

মা (সন্দেহ আর কৌতূহল মিশ্রিত গলায়):
“অভি… এ কে?”

অভি সামলে নিয়ে শান্তভাবে বলল—
“মা, এ ঐশী। আমার জীবনের আলো।”

ঐশী তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। দু’হাত জোড় করে তারপর পায়ে দুই হাত দিয়ে প্রণাম করে লাজুকভাবে বলল—
“প্রণাম কাকিমা।”

মায়ের হৃদয়ে নরম সুর

মা চুপচাপ কিছুক্ষণ ঐশীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটির চোখেমুখে ভয় নয়, বরং গভীর আন্তরিকতা। ধীরে এসে ঐশীর হাত ধরে বসলেন পাশে।

মা-
“তুমি তো বেশ মিষ্টি দেখতে আর খুব আচার-বিচার আছে দেখছি।" কিন্তু হঠাৎ এই ভোরবেলায়… অভি, তুই তো আমাদের কিছুই জানাসনি?”

অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু গলায় বললো —
“মা, আমি চেয়েছিলাম সঠিক সময়ে তোমাকে জানাতে। আজ ভেবেছি লুকোনো নয়, বরং সত্যিটাই প্রকাশ করা দরকার।”

ঐশী মৃদু গলায় যোগ করল—
“কাকিমা, আমি অভিকে হারাতে চাই না। আমি চাই ওর পাশে থাকতে, ওকে সামলাতে। আপনাদের আশীর্বাদ পেলে তবেই এই সম্পর্ক পূর্ণ হবে।”

মায়ের চোখ ধীরে ভিজে উঠল। তিনি আলতো করে ঐশীর মাথায় হাত রাখলেন আর মৃদুস্বরে বললেন "কিন্তু তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি অভির থেকে অনেকটা ছোট, এমনকি আমার ছোট ছেলে অরিজের থেকেও অনেক ছোট। আমি কি ঠিক বলছি, অভি?"

অভি কাঁপা গলায় বললো — "হ্যাঁ মা তুমি ঠিক বলছো, ও কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।"

মা ঐশীকে বললো -
"তোমার কোনও অসুবিধা নেই তো মা? মানিয়ে নিতে তোমার কোনও অসুবিধা হবে না তো!!"

ঐশী একটু লাজুক হয়ে বললো — "না কাকিমা, আমি সব জেনে বুঝেই এই সম্পর্কে জড়িয়েছি।"

মা (নমনীয় স্বরে)
"তুমি যদি সত্যিই আমার ছেলের সুখ হতে পারো, তবে আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমাদের সঙ্গে থাকবে।”

ঐশীর চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

পরিবারের অন্যরা তখনও অজানা এই বিষয়ে।

মা উঠে দাঁড়ালেন।
“তবে এখন কিছু বলো না বাবাকে। উনি প্রথমে শুনলে একটু রাগ করতে পারেন, ধীরে ধীরে বোঝাতে হবে। আর অরিজ তো এখনও ঘুমোচ্ছে। উঠে সময়মতো অফিসে চলে যাবে। ওকে পরে জানাবো।”

অভি মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে মা। ধীরে ধীরে সব হবে। আজ শুধু চাই তুমি আমাদের পাশে থাকো।”

মা স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকালেন ঐশীর দিকে।
“থাকব বাবা, আর মা, তোমাকে আমি মেয়ে হিসেবেই ভাবতে চাই, বৌমা হিসাবে নয়।”

ঐশী অশ্রু ভেজা হাসি নিয়ে মাথা নাড়ল।

চলবে....

পর্ব ২১: এক নতুন ভোর

ভোরের আলো এখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। জানালার কাঁচে শিশির জমে আছে। ঘর নিস্তব্ধ, শুধু দুই হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন ভেসে আসছে।

অভি আর ঐশী এতটা কাছে, যেন একে অপরের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা গায়ে লাগছে।

অভি ফিসফিস করে বলল—
“ঐশী, এতটা কাছে তুমি আগে কখনো এসেছো?”

ঐশী চোখ নামিয়ে নিল, ঠোঁটে কাঁপন।
“না অভি দা… কিন্তু আজ এসেছি, কারণ আমি চাই আমার বুকের ভেতর তোমার ঠিকানা হোক।”

অভির বুক ধক করে উঠল। সে ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো ঐশীর হাতের ওপর রাখল। ঐশীর হাত কাঁপছিল, কিন্তু সরে গেল না। বরং শক্ত করে চেপে ধরল অভির হাত।

অভি (মৃদু হাসি নিয়ে):
“তোমার হাত তো কাঁপছে।”

ঐশী হালকা শ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল—
“কাঁপছে ভয় থেকে নয়… তোমার ছোঁয়ার অপেক্ষা থেকে।”

অভি কিছু বলল না। শুধু ধীরে ঐশীর গাল স্পর্শ করল। আঙুলের ছোঁয়ায় ঐশী কেঁপে উঠল। চোখ বুজে ফিসফিস করে বলল—
“এভাবে ছুঁয়ো না অভি দা… আমি নিজেকে সামলাতে পারব না।”

অভি তার কানে ঝুঁকে ফিসফিস করল—
“তাহলে আজ নিজেকে আমাকে সঁপে দাও। আর অভি দা নয়। শুধু অভি।”

ঐশী মাথা তুলে তাকাল। তার চোখ আধভেজা, তবু ভেতরে জ্বলছে অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।
“আমি তো সেই জন্যই এসেছি, অভি দা… তোমার কাছে নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে।”

অভি আরও আবেগঘন হয়ে ঐশীর আরও অন্তরঙ্গ হয়ে বললো - "শুধু অভি"।

অভি আর থামতে পারল না। ধীরে ধীরে ঠোঁট রাখল ঐশীর ঠোঁটে। প্রথমে নরম, তারপর উষ্ণ, দীর্ঘ। ঐশীর হাত দুটো অভির কাঁধ জড়িয়ে ধরল, শরীর গলে গেল অভির বুকে।

চুম্বন ভাঙতেই ঐশী শ্বাস নিতে নিতে ফিসফিস করল—
“তুমি জানো না, আমি কতদিন ধরে এই মুহূর্তের জন্য বেঁচে আছি।”

অভি তার চুলে মুখ ডুবিয়ে দিল। চুলে ভিজে ফুলের সুবাস।
“ঐশী… তোমার গন্ধে আমি মাতাল হয়ে যাচ্ছি।”

ঐশী হেসে উঠল, বুকের ভেতর থেকে হালকা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
“আমি চাই, তুমি আমার গায়ের প্রতিটি গন্ধ, প্রতিটি কাঁপন চিনে নাও। আজ থেকে আমি শুধু তোমার।”

অভি তার কাঁধ থেকে আঙুল সরিয়ে গলায় রাখল। ঐশীর শরীর শিহরন তুলল।
ঐশী (চোখ বুজে):
“অভি… তোমার আঙুল আমার গলায় নামলেই কেন মনে হয় বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠছে?”

অভি ফিসফিস করে বলল—
“কারণ সেই আগুনে আমিও পুড়ছি।”

তারপর আবার ঠোঁট মিলল—এবার আরও গভীর, আরও দীর্ঘ। দু’জনেই যেন সময় ভুলে গেল।

অভি চুম্বনের ফাঁকে বলল—
“তুমি আমার রক্তে মিশে যাচ্ছো, ঐশী।”

ঐশী চোখ আধবোজা করে উত্তর দিল—
“তাহলে আজ থেকে আমি তোমার রক্ত, তোমার শ্বাস, তোমার শরীর।”

অভি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঐশী তার কোমল হাতের স্পর্শ অভির দুই গালে বুলিয়ে অভিকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে তার দুই কোমল বাহুতে জাপটে ধরে অভির চুলে আঙুল বোলাতে লাগলো আর ফিসফিস করে বলল—
“আমায় আর হারিয়ো না, অভি। আমি তোমার ঘর।”

অভি ঐশীর বাহুর অন্তরঙ্গ উষ্ণতায় নিজেকে পুরো সপে দিলো ঐশীর শরীরে আর ফিসফিস করে বললো -
“তুমি শুধু ঘর নও, ঐশী… তুমি আমার ভোর, আমার রাত, আমার সবকিছু।”

ঘরের ভেতর ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে পাখির কোলাহল, ভেতরে দু’জনার নিঃশব্দ মিলন—যেখানে প্রেম আর শরীর একসাথে গেঁথে গেল।

অভি অনেকক্ষণ বাহুবন্ধ হয়ে ঐশীর বুকে মাথা রেখে নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। শুধু দু’জনের হৃদস্পন্দন যেন একসাথে তাল দিচ্ছিল।

হঠাৎ ঐশী আলতো করে অভির চুলে হাত রেখে হেসে বলল—
“তুমি জানো, এতক্ষণ আমি শ্বাসই নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।”

অভি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল—
“তাহলে আজ থেকে প্রতিটি শ্বাস আমার ওপর ছেড়ে দাও।”

ঐশী চোখ নামিয়ে লাজুকভাবে হেসে ফেলল। তার গাল লালচে হয়ে উঠেছে।
“তুমি জানো না, এই মুহূর্তে আমি কতটা তোমার… আমি আর কিছুই ভয় পাই না।”

অভি ধীরে ধীরে তার আঙুল দিয়ে ঐশীর চুল সরিয়ে দিল। জানালার ভোরের আলোয় ঐশীর মুখ যেন দীপ্ত হচ্ছিল।
অভি (মৃদু স্বরে):
“তুমি এত সুন্দর… আমি ভেবেছিলাম আমার জীবনে আর আলো ফিরবে না। অথচ তুমি এসেছো ভোর হয়ে।”

ঐশী নরম গলায় উত্তর দিল—
“তাহলে আমাকে হারাতে দিও না। আমি চাই প্রতিটি সকাল তোমার জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কাটাতে।”

অভি হেসে বলল—
“আজ তাহলে প্রথম সকাল শুরু হলো।”

অভি উঠতে চাইলে ঐশী তার হাত টেনে নিলো।
“কোথায় যাচ্ছো?”

অভি মৃদু হেসে উত্তর দিল—
“চা বানাতে। আজ তোমার জন্য বিশেষ চা।”

ঐশী হাসতে হাসতে বলল—
“তাহলে আমি বসে থাকব, আর তুমি আমাকে খাওয়াবে। আজ থেকে আমার চাও কেবল তোমার হাতের।”

অভি রান্নাঘরে গেল। কিছুক্ষণ পর ট্রেতে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এলো। দু’জন জানালার পাশে বসল। বাইরে সূর্য উঠছে, ভিতরে তাদের চোখে নতুন দিনের আলো।

ঐশী কাপ হাতে নিয়ে তাকাল অভির দিকে—
“জানো, এই ভোরটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো। মনে হচ্ছে আমি সত্যি তোমার ঘর পেয়েছি।”

অভি কাপ নামিয়ে ঐশীর হাত ধরল।
“এটা স্বপ্ন নয়, ঐশী। এটা আমাদের নতুন শুরু।”

ঐশী ধীরে মাথা নামিয়ে অভির কাঁধে হেলান দিল। জানালার বাইরে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, আর তাদের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক অনন্ত প্রতিশ্রুতি।

চলবে....

শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ২০: অবশেষে স্বীকারোক্তি

সারা রাত অভি একটুও ঘুমোতে পারেনি। সৃজিতার বার্তা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে— “অভি, আমি তোমার সঙ্গে শেষবার কথা বলতে চাই…”

অভি জানে, এই ডাক অস্বীকার করা সহজ নয়। কিন্তু তার মন যেন কোথাও গিয়ে জড়িয়ে আছে ঐশীর চোখে, তার স্নিগ্ধ হাসিতে।

ভোরবেলা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে অভি ভাবছিল— “আমি কি তবে আবার সেই অতীতে ফিরব? নাকি নতুন এক পথে হাঁটব?”

ঠিক তখনই কলিং বেল বাজলো। অভি চমকে উঠলো, এতো ভোরে কে এলো আবার। দরজা খুলতেই দেখলো ঐশী দাঁড়িয়ে আছে, চোখে লাল আভা—ঘুমহীন রাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
অভি বেশ অবাক বিস্ময়ে - "তুমি? এতো ভোরে? ভেতরে এসো। কিছু কি হয়েছে?"
সে ধীরে ভিতরে এলো। অভি দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে গেলো। দুজনে ঘরে ঢুকলো, অভি দরজাটা ভেজিয়ে দিলো।

অভি এবার ঐশীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো - "এখন বলোতো কি হয়েছে? হঠাৎ এতো ভোরে?"

ঐশীর কণ্ঠে কাঁপন— “অভি দা, তুমি কি সত্যিই এখনও তাকে ভালোবাসো?”

অভি উত্তর দিলোনা। শুধু নিঃশ্বাস ফেলল। চোখ নামিয়ে রাখলো, যেন অপরাধী।

ঐশী আরও কাছে এলো। তার কণ্ঠ এবার দৃঢ়— “শোনো, ভালোবাসা অতীতের জিনিস নয়। ভালোবাসা মানে বর্তমান… আর ভবিষ্যত। আমি যদি তোমার বর্তমান হতে চাই, তুমি কি আমাকে সেই অধিকার দেবে না?”

অভি তাকাল তার চোখের দিকে। সে চোখে এক অদম্য টান, নির্ভেজাল বিশ্বাস।
“ঐশী… আমি ভয় পাই। ভয় পাই আবার যদি কেউ আমাকে ছেড়ে যায়?”

ঐশী অভির হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নিজের বুকের কাছে রেখে মৃদু কণ্ঠে বলল— “আমি পালাতে আসিনি। আমি এসেছি তোমার সব ক্ষত সারাতে। যদি পৃথিবী তোমাকে ফেলে দেয়, তবু আমি থাকব। তুমি কি আমায় বিশ্বাস করবে না?”

অভির বুকের ভেতর জমে থাকা বরফ যেন গলতে লাগল। সে ধীরে ধীরে ঐশীর কাছে ঝুঁকল।

ঐশী অভির মাথা নিজের কাঁধে রেখে ফিসফিস করে বলল— “তুমি আমার আশ্রয়, অভি দা। আজ থেকে আমি শুধু তোমার, তুমি শুধু আমার।”

অভি চোখ বুজে ফেলল। অতীতের সমস্ত অভিমান, ব্যথা আর ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এক মুহূর্তে যেন মিলিয়ে গেল। সে দু’হাত দিয়ে ঐশীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঐশী আবেগে অভির মাথা নিজের বুকের কাছে টেনে নিলো!

ঐশী তখন তার কানে মৃদু স্বরে বলল— “আমায় আর হারিয়ে ফেলো না অভি দা… আমি তোমার ঘর।”

সেই মুহূর্তে দু’জনের মধ্যে আর কোনো দেয়াল রইল না। কেবল এক নীরব আলিঙ্গন, যেখানে জন্ম নিল নতুন প্রেমের সূচনা।

চলবে....

পর্ব ১৯: অদৃশ্য অপেক্ষা

অভিনব ফোনে ভেসে ওঠা মেসেজটা এখনো পড়ে বসে আছে।
“অভি, আমি তোমার সঙ্গে শেষবার কথা বলতে চাই… কাল সন্ধ্যায় পুরোনো কফিহাউসে আসবে?”

এক মুহূর্তে কত বছরের স্মৃতি এসে বুকের ভেতর আঘাত করল! কিন্তু ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ করে রাখল অভি।
ঐশী তার চোখের ভেতর তাকিয়ে ছিল—চুপচাপ, কিন্তু শঙ্কায় ভরা।

অন্যদিকে, দিব্যেন্দু বাড়ি ফেরার পরও রুমার মুখ ভার। শাশুড়ি ধীরে ধীরে বললেন—
“রুমা, সংসারে ছোটখাটো অশান্তি থাকতেই পারে। কিন্তু তুমি যে দিন দিন কেমন যেন বদলে যাচ্ছো!”
রুমা উত্তর দিল না।
শাশুড়ির কণ্ঠে মমতা, কিন্তু চোখে প্রশ্ন।

রুমার ভেতরে ঝড় চলছে। অভি আবার জীবনে ফিরে আসছে—এই চিন্তাটাই তাকে অস্থির করছে। তবে কি সে সত্যিই অভিকে ভুলতে পারেনি? তবে কি সে নিজের সংসারকে অবহেলা করছে? হঠাৎ রুমার চোখে জল এলো, রুমা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নিল। কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কথা যেন চাপা দেওয়া গেল না।

ঐশী সারা রাত ঘুমোতে পারল না।
অভির ভেতরে যে দ্বিধা—সেটা যেন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
চোখ ভিজে উঠল।

সকাল হলো।
অভি চুপচাপ বইয়ের দোকানের দিকে হাঁটছে, অথচ মাথায় ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—
“আমি কি যাব কফিহাউসে?”

রুমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। শাড়ি পরে নিজেকে সাজাচ্ছে।
স্বামী দিব্যেন্দু কিছু টের না পেলেও, তার সাজের ভেতর যেন অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
আজকের দেখা…
আজকের সিদ্ধান্ত…

সন্ধ্যা নামছে।
কোলকাতার কফিহাউসের আলো একে একে জ্বলতে শুরু করেছে।
চেয়ার-টেবিলগুলো ভরে উঠছে কলেজপড়ুয়া, কবি, শিল্পীর ভিড়ে।
এক কোণে খালি একটা টেবিল—যেন কারোর অপেক্ষা করছে।

কিন্তু অভি এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। যাবে, না যাবে না?

চলবে....

পর্ব ১৮: প্রতীক্ষার ছায়া

কফিহাউসের সামনে এসে দাঁড়াল অভিনব।
দরজার ওপার থেকে ভেসে আসছে পুরোনো দিনের সুর, কফির গন্ধ। একসময় এই জায়গাটাই ছিল তার আর সৃজিতার আশ্রয়—আজ সেখানে ঢোকার সাহসই যেন হারিয়ে ফেলেছেন।

অভিনব গভীর শ্বাস নিলেন। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে অতীতের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে। অন্যদিকে, ভেতরে বসে রুমা অপেক্ষা করছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, কফির কাপে একবারও হাত দেয়নি।
সে ঘড়ি দেখে ফিসফিস করে বলল—
“অভি, তুমি আসবে তো?”

সময় গড়াচ্ছে। প্রতিটি মিনিট যেন বছরের মতো দীর্ঘ।

হঠাৎ ফোন কাঁপল অভিনবের হাতে।
প্রেরক: ঐশী
বার্তা: “তুমি কোথায়, অভি দা? আজ যেন অদ্ভুত অশান্তি লাগছে।”

বার্তাটা পড়েই অভিনবের বুক কেঁপে উঠল।
দুটি দিক তাকে টানছে—ভেতরে রুমা অপেক্ষা করছে, বাইরে ঐশীর টান।

সে দরজার দিকে এক পা বাড়িয়ে আবার থেমে গেল।
চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভেতরে রুমা চোখে জল নিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে অনুভব করল—দরজা কিঞ্চিৎ শব্দ করে খুলল কি না।
কিন্তু ঘুরে তাকাতেই দেখল… চেয়ারটা এখনও খালি।

তার বুকের ভেতর ভেঙে পড়ল প্রতীক্ষার পাহাড়। বাইরে দাঁড়িয়ে অভিনব শেষবারের মতো দরজার দিকে তাকালেন।
তারপর ধীরে ধীরে পিছন ফিরলেন।

চলবে....

পর্ব ১৭: অতীতের টানাপোড়েন

অভিনব সারা রাত ঘুমোতে পারলো না। ফোনে ভেসে ওঠা সৃজিতার সেই বার্তা—
“অভি, আমি তোমার সঙ্গে শেষবার কথা বলতে চাই। আমাকে এড়িয়ে যেও না। কাল সন্ধ্যায় পুরোনো কফিহাউসে আসবে? এটা আমার শেষ অনুরোধ।”

শব্দগুলো যেন বুকের ভেতর ছুরি চালাল। শেষবার… কেন শেষবার? কেন এখন?

ঐশীর কথাগুলোও কানে বাজছিল—
“আমি যদি তোমার বর্তমান হতে চাই, তবে কি তুমিও আমাকে সেই সুযোগ দেবে না?”

অভিনব যেন দুই দিক থেকে টানা হচ্ছে। একদিকে অতীতের সেই বিশ্বাসঘাতকতা, অন্যদিকে বর্তমানের নির্মল টান।

পরদিন সকালে ঐশীর কলেজে এক সেমিনারে এসেও তিনি অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। ঐশী বুঝল, তার ভেতরে দ্বন্দ্ব চলছে, কিন্তু কিছু না জিজ্ঞেস করে শুধু নীরব দৃষ্টিতে তাকে শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করল।

এদিকে, রুমা (সৃজিতা) সংসারের ভেতর নিজের ভূমিকা সামলাচ্ছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন, মেয়েকে মানুষ করা—সবই যেন ঠিকঠাক চলছে বাইরে থেকে। কিন্তু তার অন্তরে তোলপাড়। গত রাতে পাঠানো সেই বার্তার কোনো উত্তর আসেনি। তবু মনে হচ্ছিল, অভিনব আসবেই। অন্তত একবার তাকে শোনাতে চায়, যে সে এখনও তাকে ভালোবাসে।

দিব্যেন্দু সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল, একবারও স্ত্রীর চোখে তাকাল না। শাশুড়ি হালকা গলায় বললেন—
“রুমা, সংসারের কষ্ট সহ্য করাই তো মেয়েদের নিয়তি। কিন্তু মনে রেখো, নিজের শক্তিটা কখনও হারাতে নেই।”

রুমা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। কিন্তু মনে মনে ফিসফিস করল—
“শক্তি নয়, আমি এখন শুধু মুক্তি চাই। অন্তত একবার, নিজের মতো করে।”

বিকেলের দিকে অভিনব কলেজ থেকে বেরোলেন। ফোনে ঐশীর কয়েকটা কল এল, কিন্তু তিনি ধরলেন না। তার পদক্ষেপ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সেই পুরোনো কফিহাউসের দিকে।

অন্যদিকে, রুমা বাড়িতে শাশুড়ির কাছে মেয়েকে রেখে নিজেই বেরিয়ে পড়ল। গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশা নিল।
মনে হচ্ছিল—আজকের দেখা তার জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা হতে চলেছে।

কফিহাউসের ভিতরে দু’টো অচেনা চেয়ার খালি পড়ে ছিল।
একদিকে অভিনব এগিয়ে আসছেন, অন্যদিকে রুমাও পৌঁছে যাচ্ছে ঠিক তখনই।

চলবে....

পর্ব ১৬: সিদ্ধান্তের সীমানা

ঐশীর চোখের গভীর টানে অভিনব যেন আটকে গেল।
তার বুকের ভেতর ঝড়—কিন্তু ঠোঁটে নীরবতা।

একটু দূরে হাওয়ার ঝাপটা আসতেই মনে হল যেন শহরের সমস্ত আলো নিভে যাচ্ছে, আর শুধু ঐশীর কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে—
“তুমি যদি আজও চুপ থাকো, আমি বুঝব তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছো।”

অভিনব মুখ তুললেন। তার চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, কিন্তু কোথাও এক বিন্দু আলোও আছে।
“ঐশী… আমি তোমাকে আঘাত করতে চাই না। কিন্তু আমি এখনও আমার অতীতের বেড়াজালে বন্দি। সেই বেড়াজাল, আমার জীবন থেকে চলে গিয়েও… আমাকে আজও মুক্তি দেয়নি। তাই আমার প্রেমের প্রতি এক ভীতি তৈরী হয়েছে। সেটা মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি আমার মন।”

ঐশী তার হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
“অভি দা, অতীত মানেই তো সমাধানহীন বোঝা নয়। আমি যদি তোমার বর্তমান হতে চাই, তবে কি তুমিও আমাকে সেই সুযোগ দেবে না?”

অভিনব কিছু বলার আগেই, হঠাৎ তার ফোনে ভেসে উঠল একটি বার্তা—
প্রেরক: সৃজিতা
বার্তা: “অভি, আমি তোমার সঙ্গে শেষবার কথা বলতে চাই। আমাকে এড়িয়ে যেও না। কাল সন্ধ্যায় পুরোনো কফিহাউসে আসবে? এটা আমার শেষ অনুরোধ।”

অভিনবের বুক ধক করে উঠল। অভিনব একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো।

ঐশীর চোখে তখন অদ্ভুত এক শঙ্কা। ঐশী জিজ্ঞেস করাতে বললো, "সেই বেড়াজাল।"

ঐশী ধীরে বলল—
“দেখলে তো? ভাগ্যও যেন তোমাকে পরীক্ষা নিতে চাইছে।”

নিঃশব্দ আকাশে ভেসে এল অচেনা এক অগ্নিপরীক্ষার ছায়া।

অন্যদিকে…

দিব্যেন্দু বাড়ি ফিরল অনেক রাত করে। রুমা (সৃজিতার ডাক নাম) তাকে চুপচাপ দেখছিল। বাড়ির নিস্তব্ধতা যেন শূন্যতার মতো ঘিরে ধরেছে।

দিব্যেন্দু হঠাৎ বিরক্ত গলায় বলল—
“তুমি সবসময় মুখ ভার করে থাকো কেন? সংসার কি শুধু আমার দায়িত্ব?”

রুমার গলায় ক্ষোভ আর কান্না মিশে গেল—
“সংসার যদি শুধু দায়িত্ব হয়, তবে ভালোবাসা কোথায় দিব্যেন্দু? তুমি কি আর কোনোদিন সেটা খুঁজে দেখেছ?”

চলবে....

বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ১৫: অগ্নিপরীক্ষা

সেদিন সন্ধ্যায় সাহিত্য আলোচনা শেষে সবাই যখন বিদায় নিচ্ছে, ঐশী হঠাৎ অভিনবের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—
“স্যার, একটু আমার সঙ্গে আসবেন? আপনাকে কিছু দেখাতে চাই।”

অভিনব প্রথমে দ্বিধা করলেও তার চোখের দৃঢ়তা দেখে রাজি হলেন। ঐশী তাকে নিয়ে গেল কলেজের লাইব্রেরীর ছাদে।
শহরের আলো ঝলমলে রাত, দূরে গঙ্গার ওপারে অন্ধকার মিশে গেছে আকাশের সঙ্গে।

ঐশী ধীরে ধীরে বলল—
“আপনার লেখা পড়ে আমি শুধু সাহিত্য শিখিনি, শিখেছি বাঁচতে। আপনি জানেন, আমার কাছে আপনি শুধু সাহিত্যিক নন… আপনি আমার পৃথিবী।”

অভিনব চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো। মনে হচ্ছিল, বাতাসে একটা অদৃশ্য স্রোত বইছে—যেখানে আবেগের টান অস্বীকার করা অসম্ভব।

হঠাৎ ঐশী এগিয়ে এসে তার দুই হাত নিজের হাতে ধরে ফেলল।
“আমি জানি, আপনার ভেতরে অনেক দ্বিধা, অনেক অতীতের বোঝা আছে। কিন্তু আমি চাই, তুমি আমাকে একবার সুযোগ দাও। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—আমি তোমার সব শূন্যতা ভরে দেব।”

অভিনব হতবাক। তার বুকের ভেতর ঝড় বইছে। মনে পড়ছে সৃজিতার বার্তা, সেই নীরবতা। আর অন্যদিকে ঐশীর চোখে এক অদম্য আকর্ষণ, এক নিবিড় ভালোবাসা।

এক মুহূর্তের জন্য অভিনব ঐশীর হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছিলেন। কিন্তু তার গলার স্বর কেঁপে উঠল - 
“ঐশী, তুমি জানো না তুমি কী চাইছো। আমার জীবন সহজ নয়।”

ঐশী দৃঢ় দৃষ্টিতে উত্তর দিল—
“সহজ না হলেও আমি আছি, অভি দা। আমি শুধু তোমার সঙ্গে লড়তে চাই, পালাতে নয়।”

নীরবতা ভরে উঠল চারপাশে। শহরের আলো যেন দু’জনকে ঘিরে ফেলেছে। অভিনবের ভেতরে তখন দ্বন্দ্বের আগুন জ্বলছে—একদিকে অতীতের প্রতিধ্বনি, অন্যদিকে বর্তমানের আকর্ষণ।

চলবে....

পর্ব ১৪: নীরবতার দেওয়াল

রাতের অন্ধকার পেরিয়ে ভোর হলো।
সৃজিতা বারবার ফোন হাতে তুলে নিচ্ছিল, আবার নামিয়ে রাখছিল।
বার্তা পাঠানোর পর থেকে কতবার সে চেক করেছে—
"অভি কি উত্তর দিল?"

কিন্তু পর্দা নীরব।
কোনো উত্তর নেই।

সকালে চা খেতে খেতে দিব্যেন্দু বলল,
“আজ রাতে হয়তো ফিরতে পারব না। নতুন প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত আছি।”
সৃজিতা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

ভেতরে জমে উঠছে এক অদ্ভুত অভিমান।
"অভি কি এতোটাই বদলে গেছে? নাকি আমি তার জীবনে আর কোনো মানেই রাখি না?"

মেয়েটা ঘুম থেকে উঠে তার আঁচল ধরে খেলতে লাগল।
সেই ছোট্ট স্পর্শে বুক ভরে এলো ভালোবাসায়।
কিন্তু মনে হলো—এই ভালোবাসার মাঝেও যে মানুষটাকে সে খুঁজছে,
সে নেই।

সন্ধ্যায় একা ঘরে বসে আবার ফোন খুলল।
অভিনবের প্রোফাইল ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
কত চেনা সেই মুখ, অথচ কত দূরে!

নিজের ডায়েরিতে লিখল—
“তার নীরবতা আজ আমার প্রশ্নের থেকেও ভারী হয়ে গেল।
হয়তো আমি দেরি করে ফেলেছি…
তবু, কেন মনে হচ্ছে, আমাদের গল্প এখনও অসমাপ্ত?”

চোখ ভিজে উঠল অশ্রুতে।
সে চুপচাপ লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু বুকের ভেতরে যেন জ্বলছে প্রশ্নের আগুন—
“অভি, তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেলে?”

অন্যদিকে—
অভিনব খাতার পাতায় লিখে যাচ্ছে নতুন গল্প। ঐশীর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের স্মৃতি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে।
কিন্তু প্রতিটি শব্দের ফাঁকে ভেসে উঠছে সেই এক নাম—
সৃজিতা।

চলবে....

পর্ব ১৩: নীরবতার উত্তর

অভিনবের ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সেই নাম—
“সৃজিতা”।

চোখ যেন বিশ্বাসই করতে চাইছে না। বছরের পর বছর পর এভাবে হঠাৎ?
সে ধীরে ধীরে বার্তাটা পড়ল —
“আমাদের গল্প কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?”

অভিনবের বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। খাতার কলম পড়ে গেল মেঝেতে। চোখ ভিজে উঠল অদ্ভুত আবেগে—
একসঙ্গে বেদনা, ভালোবাসা, আর অপূরণীয় শূন্যতা।

মুহূর্তে মনে পড়ল সেই দিনগুলো—
অভিনবর বাড়িতে টিউশন পড়ানোর সময় সৃজিতার হাসি, কবিতার প্রতি তার অদ্ভুত টান, আর একদিনের বিদায়—
যেখানে অভিনব শুধু দাঁড়িয়ে ছিল, কিছুই বলতে পারেনি।
মুঠোফোন হাতে কাঁপতে কাঁপতে টাইপ করতে শুরু করল—
“তুমি হঠাৎ এখন কেন মনে পড়লে? আমিও কি ভুলে গিয়েছিলাম তোমাকে?”

কিন্তু পাঠানোর আগেই থেমে গেল। ঐশীর হাসি হঠাৎ ভেসে উঠল মনের পর্দায়। তার সাহসী স্বীকারোক্তি, তার স্বপ্নময় চোখ।

অভিনব হাত থরথর করে কাঁপছিল। বার্তাটা মুছে চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আমি যদি উত্তর দিই, আমার অতীত আবার আমায় গ্রাস করবে। কিন্তু যদি না দিই, তবে কি এই নীরবতাই তার কাছে উত্তর হয়ে থাকবে?"

ফোনটা টেবিলে রেখে সে জানলার দিকে তাকাল। চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। মনে হলো, আলোটা যেমন ধরা যায় না, তেমনি তার অতীতও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

ফোনে নতুন মেসেজের টোন বেজে উঠল—
ঐশী লিখেছে,
“স্যার, আজ সারাদিন শুধু আপনাকেই ভেবেছি।”

অভিনব অসহায়ের মতো দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।
তার মনের ভেতর তখন দ্বিধার এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

চলবে....

পর্ব ১২: গোপন বার্তা

রাত গভীর। ঘরে দিব্যেন্দু ফেরেনি, বিদেশ সফরের অজুহাত এখন নিত্যকার। সৃজিতা একা শুয়ে আছে। জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকছে অর্ধেক চাঁদের আলো।

শরীরের ক্লান্তি থাকলেও ঘুম নেই। বুকের ভেতর যেন অস্থিরতা জমে উঠছে।
বিছানার পাশের টেবিলে রাখা ডায়েরি খুলল সে। পাতা ভরে আছে অভির স্মৃতিতে—
কবিতা, আঁকিবুঁকি, আর কিছু অপূর্ণ প্রশ্ন।

সে লিখতে শুরু করল—
"তুমি কি জানো, আমি এখনও তোমার লেখা পড়ে কাঁদি?
তুমি কি জানো, আমার মেয়ের চোখে কখনও কখনও তোমার ছায়া খুঁজে পাই?"

লিখতে লিখতেই হাত থেমে যায়।
মনে হলো, এইসব শুধু ডায়েরির পাতায় আটকে রাখলে চলবে না।

দ্বিধা ভেঙে ফোন হাতে তুলে নিল সে।
অভিনবের নাম্বার এখনও মনে আছে—বছরের পর বছর কেটে গেলেও ভুলতে পারেনি।

আঙুল কাঁপছিল।
অনেকবার টাইপ করে আবার মুছে দিল।
অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে লিখল—

“অভি… আমি জানি, এই বার্তা হয়তো তোমার কাছে অপ্রত্যাশিত।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আজও আমাকে তাড়া করে—
আমাদের গল্প কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?”

বার্তা পাঠানোর বোতামে চাপ দিল সে।
এক মুহূর্তের জন্য বুক থমকে গেল, তারপর অদ্ভুত হালকা লাগল।

মেয়েটা পাশেই ঘুমিয়ে আছে, তার নিঃশ্বাসের শব্দ যেন মায়ার পরশ।
সৃজিতা ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বুজতেই বুকের ভেতর ফিসফিস করে উঠল—
“অভি, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”

অন্যদিকে—
অভিনব তখনও ঘুমোতে পারেনি। খাতার পাতায় কলম ঘুরছিল।
হঠাৎ ফোনের আলো জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই নাম—সৃজিতা।

অভিনব স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
চোখে জল ভরে উঠল।

চলবে....

পর্ব ১১: অনুচ্চারিত কাছাকাছি

সন্ধ্যার আলো ঢলছে। কোলকাতার এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফেরার পথে ঐশী হঠাৎ উদয় হলো কোথা থেকে আর বললো —
“স্যার, একটা কথা ছিলো। একটু আমার সাথে হাঁটবেন? এত সুন্দর আবহাওয়া, নষ্ট করতে ইচ্ছে করছে না।”

অভিনব মাথা নাড়লেন। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাল গঙ্গার ঘাটে। বাতাসে শীতল হাওয়া, দূরে দীপশিখার মতো ভেসে যাচ্ছে নৌকার আলো।

ঐশী ধীরে ধীরে বলল—
“আপনি জানেন, আপনার কাছে এলে আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কাঁপুনি হয়। মনে হয়, এই পৃথিবীতে আর কিছুই চাই না।”

অভিনব এক মুহূর্ত চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার চোখে দীপ্তি, ঠোঁটে কাঁপা হাসি—এক অনাবিল তরুণ আকর্ষণ।

হঠাৎ একটা বাতাসে ঐশীর খোলা চুল উড়ে এসে ছুঁয়ে গেল অভিনবের মুখে।
অভিনব হাত বাড়িয়ে চুল সরিয়ে দিতে গিয়েই থেমে গেলেন।

ঐশী ধীরে ফিসফিস করে বলল—
“ভয় পাচ্ছেন কেন, স্যার? আমি তো শুধু আপনাকেই চাই…”

অভিনবের বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব তীব্র হলো। সৃজিতা… অতীত… দায়িত্ব…
কিন্তু ঐশীর চোখের টানে যেন সবকিছু মুহূর্তে গলে যাচ্ছে।

অভিনব অবশেষে এক নিঃশ্বাসে তার হাত ধরে ফেললেন।
দু’জনের চোখে চোখ, অদ্ভুত নীরবতা।
মনে হলো, চারপাশের পৃথিবী থেমে গেছে।

ঐশীর কণ্ঠে এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি—
“এই মুহূর্তটা চাই, শুধু আমার জন্য।”

অভিনব আর কিছু বললো না।
তাদের মাঝের দূরত্ব অদৃশ্য হয়ে গেল, যেন দু’জনেই ডুবে গেলেন এক অনুচ্চারিত উষ্ণতায়।

কিন্তু ঠিক সেই সময় দূরে ভেসে এলো মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ।
অভিনব হঠাৎ যেন বাস্তবে ফিরে এলেন। হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

মনে মনে বললেন—
“আমি কি ভুল করছি? নাকি এই ভুলটাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা?”

ঐশীর চোখে তখন এক অদ্ভুত ঝলক—
অর্ধেক ভালোবাসা, অর্ধেক দাবি।

চলবে....

পর্ব ১০: প্রতিধ্বনি বনাম বর্তমান

অভিনবের ঘরে টেবিলল্যাম্পের মৃদু আলো। চারপাশে বইয়ের স্তূপ, খাতার পাতা খোলা। অথচ কলম চলছে না।
ঐশীর সাহসী স্বীকারোক্তি বারবার কানে বাজছে—
"আমি আপনাকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসি।"

অভিনব চোখ বন্ধ করতেই ভেসে ওঠে আরেক মুখ—
সৃজিতা।
বইমেলার সেই দৃশ্য, কোলে ছোট্ট মেয়ে।
সেই চোখ দুটোতে এখনও কি তার জন্য কোনো কথা লুকিয়ে আছে?

অভিনব নিঃশ্বাস ছাড়ল।
"ঐশী তরুণী, তার ভবিষ্যৎ এখনও গড়ার বাকি। আমি কি তাকে নিজের নিঃসঙ্গতার ভরসা বানাবো? আর সৃজিতা… যাকে হারিয়েছি, তবুও ভুলতে পারিনি।"

খাতার পাতায় লিখতে শুরু করল—
“কিছু সম্পর্ক একান্ত প্রয়োজনীয় অথচ অসম্ভব।
কিছু সম্পর্ক অসম্পূর্ণ হলেও অনন্ত।”

ঠিক তখনই ফোনে মেসেজ আসে—ঐশী লিখেছে,
“স্যার, আপনার চোখের নীরবতা আমাকে তাড়া করছে। জানেন, আমি স্বপ্ন দেখেছি—আপনার সঙ্গে একসঙ্গে লিখছি, হাঁটছি, বাঁচছি।”

অভিনবের বুক কেঁপে ওঠে।
সে দ্রুত ফোন সরিয়ে রাখে।
কিন্তু মনে মনে স্বীকার করল—ঐশীর নিষ্পাপ ভালোবাসা তাকে অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরিয়ে তুলছে।

অন্যদিকে, সৃজিতা—
রাতের নির্জনতায় দিব্যেন্দুর পাশে শুয়ে থেকেও হাহাকার অনুভব করছে। শরীরের ঘনিষ্ঠতা ভরপুর থাকলেও মন যেন দূরে সরে গেছে।
সে চুপচাপ নিজের ডায়েরি খুলে লিখছে—
“আমার ভেতরে যে শূন্যতা বাড়ছে, তার নাম কি অভিনব?”

ঐশী এদিকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল খোলা রাখে।
তার চোখে দীপ্ত স্বপ্ন—
“অভি স্যার যতই অতীতের ছায়ায় বাঁধা থাকুন না কেন, আমি তাকে নতুন ভোর দেখাবো।”

অভিনব আবার খাতার পাতায় লিখে চলে—
“প্রতিধ্বনির মতো একটা নাম আমায় তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু যদি নতুন কোনো সুর এসে ঢেকে দেয় সেই প্রতিধ্বনিকে?
আমি কি শুনব সেই নতুন গান?”

চলবে....

পর্ব ৯: সাহসের প্রথম ছোঁয়া

কয়েকদিন কেটে গেছে। ঐশী আর অভিনবের মধ্যে ই-মেইল ও বার্তা চলতে থাকলেও ঐশীর মন ভরে না।
তার মনে হয়, ভিড়ের আড়ালে নয়—অভি স্যারের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেই হবে।

এক বিকেলে সে সাহস সঞ্চয় করে অভিনবকে মেসেজ পাঠালো - “স্যার, কাল বিকেলে কলেজের লাইব্রেরীর পেছনে পুরনো অশ্বত্থ গাছটার কাছে একটু দেখা করবেন? আমার কিছু বলার আছে।”

অভিনব প্রথমে দ্বিধায় পড়লেন। “একজন দ্বিতীয় বর্ষের কলেজ ছাত্রীর সঙ্গে একান্তে দেখা করা ঠিক হবে তো?”
তবুও মনের গহীনে কৌতূহল জন্ম নিল।

পরদিন বিকেলে—
রোদ ঝিমিয়ে এসেছে। নির্জন অশ্বত্থগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে ঐশী। সাদা সালোয়ার-কামিজে তার সরল সৌন্দর্য আরও উজ্জ্বল।
অভিনব পৌঁছাতেই সে একবার গভীরভাবে তাকাল, তারপর বলল— “স্যার, আমি শুধু ভক্ত নই… আমি আপনাকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসি।”

অভিনব স্তব্ধ।
কণ্ঠ শুকিয়ে এল।
“ঐশী, তুমি কি জানো তুমি কী বলছ? আমাদের মধ্যে অনেক দূরত্ব… বয়স, অভিজ্ঞতা—সবকিছু।”

ঐশী দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
“দূরত্ব থাকলে থাকুক। আমার মনে হয়, আপনি একা। আর আমি চাই আপনার পাশে থাকতে। সেটা যদি ভালোবাসা হয়, হোক।”

অভিনব চোখ ফিরিয়ে নিলেন। বুকের ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন।
“আমি কি আবার আবেগে ভেসে যাচ্ছি? নাকি সত্যিই এই মেয়েটি আমাকে নতুন জীবন দেখাচ্ছে?”

ঐশী এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে বলল—
“আপনার গল্পে সব চরিত্র অসমাপ্ত থাকে না, স্যার। আমি হবো সেই চরিত্র, যে আপনার গল্পকে পূর্ণ করবে।”

অভিনব চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার ভেতরের দ্বন্দ্ব যেন আরও গভীর হলো—অতীতের প্রতিধ্বনি বনাম বর্তমানের আকর্ষণ।

চলবে....

পর্ব ৮: অদৃশ্য কাছাকাছি

এক শনিবার বিকেল। কোলকাতার এক ক্যাফেতে সাহিত্য আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে অভিনব বেরোচ্ছিলেন। হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়ানো ঐশী ডাক দিল—
“স্যার, একটু সময় পাবেন?”

অভিনব থমকে দাঁড়ালেন। ক্যাফের ভিড় থেকে তারা বেরিয়ে এল পার্ক স্ট্রীটের গাছতলায়। শরতের হালকা বাতাসে উড়ে আসছে শুকনো পাতা।

“তুমি একা?” —অভি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
ঐশী মুচকি হাসল,
“হ্যাঁ, আজ ইচ্ছে হলো শুধু আপনার সঙ্গে গল্প করতে। সবসময়ই তো ভিড় থাকে, আপনার কাছে খোলা মনে কিছু বলা যায় না।”

দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাল কাছের এক নিরিবিলি চায়ের দোকানে। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ঐশী হঠাৎ বলল—
“আপনার চোখে এমন একটা অদ্ভুত একাকীত্ব আছে, স্যার। মনে হয় যেন অনেক ভিড়ের মধ্যেও আপনি একা।”

অভিনব চুপ করে রইলেন। এই কথাটা আগে কেউ বলেনি, অথচ এই মেয়েটি প্রথম দেখাতেই তার অন্তরটা পড়ে ফেলছে।

কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
“একজন লেখক সবসময়ই একা থাকে, ঐশী। কারণ তার ভেতরে এমন কিছু স্মৃতি থাকে, যা কারও সঙ্গে ভাগ করা যায় না।”

ঐশী চোখ মেলে তাকাল—
“তাহলে আমাকেও আপনার সেই স্মৃতির ভেতরে ঢুকতে দেবেন না? আমি কি কেবল পাঠক হয়েই থাকব?”

অভিনব কিছু বললেন না। শুধু তার দিকে তাকালেন। ঐশীর চোখে অদ্ভুত দীপ্তি, তারুণ্যের নির্ভীক আকর্ষণ। এক মুহূর্তের জন্য অভির মনে হলো, তিনি যেন আবার বেঁচে উঠছেন।

কিন্তু ঠিক তখনই মনের গহীনে ভেসে উঠল সৃজিতার মুখ।
কোলের ছোট্ট মেয়েটি, ভিড়ের মাঝে দাঁড়ানো সেই চিরচেনা অবয়ব।
অভি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলেন।

ঐশী টের পেলেন, তবুও মৃদু স্বরে বলল—
“আপনি চাইলে আমি কেবল আপনার লেখা পড়ে বাঁচব, কিন্তু মনে রাখবেন… আমি আপনাকে শুধু লেখক হিসেবে দেখি না।”

অভিনব নিঃশব্দে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন।
তার বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব দোলা দিচ্ছে—
“আমি কি আবার আবেগে ভাসছি? নাকি সত্যিই নতুন করে শুরু করার সময় এসেছে?”

চলবে....

পর্ব ৭: দ্বিধার সীমানা

রাত গভীর। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় খাতা খোলা, অথচ অভিনব লিখতে পারছে না। কলম বারবার থেমে যাচ্ছে। মনে ভেসে উঠছে দুটি মুখ—
একদিকে সৃজিতা, যে একসময় তার কবিতার প্রতিটি লাইনে শ্বাস নিত।
অন্যদিকে ঐশী, যার চোখে আছে নতুন জীবনের দীপ্তি, ভরসার প্রতিশ্রুতি।

অভিনবের বুকের ভেতর কাঁপন জাগে।
“আমি কি আবার আবেগের জালে জড়িয়ে পড়ছি? নাকি এটা নতুন করে বাঁচার সুযোগ?”

সেই মুহূর্তে ফোনে মেসেজ আসে। ঐশী লিখেছে—
“স্যার, আজ রাতে আপনার লেখা পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হলো, মানুষ যদি বারবার হেরে যায়, তবুও নতুন লড়াই শুরু করতে পারে। আপনি আমার কাছে সেই সাহস।”

মেসেজ পড়ে অভিনবের ভেতরে উষ্ণতা ছড়িয়ে যায়।
কিন্তু ঠিক তখনই মনে পড়ে যায় বইমেলায় দেখা সেই দৃশ্য—
সৃজিতা, কোলে ছোট্ট মেয়ে।
চোখাচোখি না হলেও অভি বুঝেছিল, সেই নারী আজও তার ভেতরে রয়ে গেছে।

সে খাতার পাতায় লিখে ফেলে—
“মানুষের হৃদয় হয়তো নদীর মতো—দুই তীরে দুই রূপ। এক তীরে অতীতের বালি, অন্য তীরে নতুন সবুজ। কিন্তু মাঝের স্রোতটা? তা চিরকাল দ্বিধায় ভাসতে থাকে।”

অন্যদিকে সৃজিতা—
রাতের নির্জনতায় স্বামীর পাশে শুয়ে থেকেও ভীষণ একা। দিব্যেন্দুর গায়ে এখনো ব্যবসার ক্লান্তি লেগে আছে, তবুও সে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে স্ত্রীর শরীর জড়িয়ে ধরে।
এক মুহূর্তের জন্য সৃজিতার শরীর কেঁপে ওঠে—দাম্পত্যের উষ্ণতা এখনও আছে তাদের মধ্যে, শারীরিকভাবে তারা কাছে আসে, একে অপরকে অনুভব করে।

কিন্তু সৃজিতার মনে তবুও অদ্ভুত শূন্যতা থেকে যায়।
যেন শরীর মিলে গেলেও, আত্মা দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
দিব্যেন্দু কিছুটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

কিন্তু সৃজিতা নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে—
“এ সম্পর্ক কি শুধু শরীরের বাঁধনে বেঁচে আছে? হৃদয়ের বন্ধন কি সত্যিই আর নেই?”
তার বুকের ভেতর ফিসফিস করে ওঠে—
“আমি কি কখনও আবার অভিকে খুঁজে নিতে পারব?”

ঐশী এদিকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল বাঁধছে।
চোখে উজ্জ্বল স্বপ্ন, মনে দৃঢ় সংকল্প।
“অভি স্যার যতই অতীতের ছায়ায় ডুবে থাকুন না কেন, আমি তাকে আলোয় আনব।”

চলবে....

পর্ব ৫: নতুন আলোর ছায়া

বছরখানেক কেটে গেছে।
কোনও এক শীতকালে ময়দান চত্বরে বইমেলার ব্যস্ততা শেষ হতে না হতেই অভিনবের দিনগুলো ভরে উঠল নতুন আমন্ত্রণে—সাহিত্যসভা, আলোচনাচক্র, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এক বিকেলে উত্তর কোলকাতার এক কলেজে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রথম দেখা তার সঙ্গে—
ঐশী। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বেশ সুন্দরী, ছিপছিপে চেহারা, শাড়ির আড়ালে যেন তারুণ্যের স্বচ্ছ দীপ্তি। চোখে সারল্যের দীপ্তি, কণ্ঠে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। প্রশ্নোত্তর পর্বে সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে—
“স্যার, আপনার গল্পে যে চরিত্ররা অসমাপ্ত থেকে যায়, তারা কি বাস্তবের মানুষ?”

অভিনব কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ। মনের গোপন কক্ষ যেন কেউ হঠাৎ খুলে ফেলল। সে শুধু হেসে বলল— “অসমাপ্ততাই তো জীবনের স্বাভাবিক রূপ। হয়তো আমরাই সেই চরিত্র, যারা নিজেদের গল্প শেষ করতে পারিনি।”
ঐশীর চোখে ভেসে উঠল মুগ্ধতা। সেই দিন থেকেই শুরু হলো তার এক নতুন অভ্যাস—অভিকে ই-মেইলে নিজের লেখা পাঠানো। প্রথমে ছোট ছোট কবিতা, তারপর গল্প। অভিনব অবাক হয়ে দেখে—এই তরুণী লেখার ভেতরে অদ্ভুত এক পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে রেখেছে।

এক রাতে মেইলের উত্তরে লিখতে গিয়ে অভির মনে প্রশ্ন জাগে— “এই আলাপ কি আমার জীবনের নতুন দিগন্তের শুরু, নাকি কেবল অস্থায়ী সান্ত্বনা?”

অন্যদিকে— সৃজিতা সংসারের ভিড়ে থেকেও একাকীত্বে ডুবে থাকে। দিব্যেন্দুর ব্যস্ততা বেড়েই চলেছে। আর খবরের কাগজে অভির নতুন বইয়ের উৎসর্গপত্র দেখে তার বুক আবার কেঁপে ওঠে— “যারা আমার লেখা পড়ে নিজের জীবনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন, তাদের জন্য।”
সেই লাইন যেন তার অদৃশ্য অতীতকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

চলবে....

পর্ব ৬: অদ্ভুত সান্নিধ্য

কোলকাতার এক শীতল দুপুর। কলেজের কর্মশালা শেষ হওয়ার পর সবার ভিড় কমে এসেছে। অভিনবকে ঘিরে তখনও কিছু ছাত্র-ছাত্রী দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে। হঠাৎ ঐশী ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। হাতে তার খাতা, ভেতরে কয়েকটা লেখা।

“স্যার,” সে লাজুক গলায় বলল, “আপনার জন্য একটা কবিতা লিখেছি।”

অভিনব খাতা নিলেন। কয়েকটা লাইন পড়তেই তার ভেতর কেঁপে উঠল—
অপরিণত শব্দ, অথচ তাতে অদ্ভুত সত্যের ঝলক।
তিনি তাকালেন ঐশীর দিকে।
“তুমি এত ছোট হয়ে এত গভীরভাবে ভাবো কেমন করে?”

ঐশী হেসে উত্তর দিল,
“আপনার লেখা পড়ে শিখেছি, স্যার। মানুষ যদি নিজের বেদনা লুকিয়ে রাখে, তবে সে কখনও লেখক হতে পারে না। আপনার গল্পগুলো আমাকে সাহস দেয়।”

অভিনব চুপ করে গেলেন।
এই মেয়েটির চোখে যেন তিনি নিজের অতীতের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন—যে চোখ একসময় সৃজিতার ছিল।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঐশী বলল,
“আপনার জীবনের কোনো চরিত্র কি আমার মতো? মানে, আমি কি কোনোদিন আপনার গল্পে জায়গা পাবো?”

অভিনব হেসে উঠলেন, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে চাপা কষ্ট ছিলো।
“প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো গল্পের চরিত্র, ঐশী। তবে সব গল্পের শেষ সুখের হয় না।”

ঐশী খেয়াল করল—অভির চোখ দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।
সে বুঝল, এখানে এমন এক ইতিহাস আছে, যা তার অজানা।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঐশীর মনে এক প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল—
“আমি অভি স্যারের অসমাপ্ত গল্পের অংশ হবো। যেভাবেই হোক।”

অন্যদিকে সেই সন্ধ্যায়—
সৃজিতা আবার একা বসে টিভিতে দেখছে অভির সাক্ষাৎকার। তার বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়ছে।
সে ভাবছে—
“আমি কি সত্যিই ভুল করেছি? নাকি সময়ই আমাকে ভুল প্রমাণ করছে?”

চলবে....

পর্ব ৪: অদৃশ্য সেতুবন্ধন

সন্ধ্যার পর নিস্তব্ধ ঘরে সৃজিতা বসে থাকে জানলার পাশে। ছোট্ট মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আকাশে পূর্ণিমার আলো, অথচ তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হাহাকার। হাতে টিভির রিমোট, চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ চোখে পড়ে—অভিনবের সাক্ষাৎকার।

অভি হাসিমুখে বলছে,
“লেখা আমার কাছে শুধু শিল্প নয়, এটা জীবনের আরেক নাম। যেখানে বেদনা-আনন্দ সবই সমানভাবে আশ্রয় খুঁজে পায়।”

এই কথাগুলো শুনেই সৃজিতার বুক কেঁপে ওঠে। তার মনে হয়, এই কথার প্রতিটি অক্ষর যেন শুধু তার জন্যই লেখা।

অন্যদিকে অভিনব—
প্রতিষ্ঠার আলোয় তিনি ঘেরা হলেও নিঃসঙ্গতার ছায়া আরও গাঢ়। অনেক পাঠিকা চিঠি লেখে, কেউ কেউ কাছে আসার চেষ্টাও করে। কিন্তু অভির চোখে সেই মায়াবী আভা আর দেখা যায় না, যা একসময় কেবল সৃজিতার জন্য ছিল। তবুও
বইমেলায় দেখা সেই ক্ষণিকের দৃশ্য, ছোট্ট মেয়েকে কোলে নিয়ে সৃজিতার হাসি—তা ভুলতে পারেন না।

এদিকে দিব্যেন্দু—
তার ব্যবসার ব্যস্ততা যেন সীমাহীন। এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই বিরক্ত মুখে বলে,
“সবসময় আমি কি পারব তোমার সঙ্গে বসে গল্প করতে? ব্যবসাটা ছেলেখেলা নয়।”
সৃজিতা চুপ করে থাকে। সে জানে, উত্তর দিলে সম্পর্কের দূরত্ব আরও বাড়বে। কিন্তু নীরবতার মধ্যেই সে বুঝতে পারে—এক অদৃশ্য ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যা কোনওদিনই সহজে ভরাট করা যাবে না।

কয়েকদিন পর—
এক পুরনো বান্ধবী সৃজিতাকে ফোন করে বলে,
“শুনলি? অভি এবার এক সাহিত্য সেমিনারে বক্তব্য রাখবে। যাবি দেখতে? চল আমি আর তুই দেখে আসি, অভির সাথে  দেখাও হয়ে যাবে তোর।”
সৃজিতার বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে ভাবে—
“আমি কি যাবো? আমি কি আবার অভির সামনে দাঁড়াতে পারব?”

অভিনবও অন্য প্রান্তে নিজের খাতার পাতায় লিখছে—
“কিছু প্রশ্ন সময়ের কাছে অমীমাংসিত থাকে। হয়তো উত্তরগুলো আমাদের সামনে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করে, শুধু সাহসের অভাবেই আমরা তা খুঁজে পাই না।”

চলবে.....

পর্ব ৩: অতীতের প্রতিধ্বনি

অভিনব এখন আর শুধু "অভি স্যার" নন—বাঙালি সাহিত্য জগতে তিনি এক নতুন আলো। প্রবন্ধ, ছোটগল্প, এমনকি এক প্রকাশনা সংস্থা থেকে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ বেরিয়ে গেছে। বইমেলায় স্বাক্ষর দিতে যেতে হয় তাকে। ছোট ভাই চাকরি পেয়েছে, সংসারে স্বস্তির হাওয়া। বাবা-মা গর্বে ভরে ওঠেন, মা মাঝে মাঝে বলেন—
“যদি তোমার লেখা পড়ে তোমার ছাত্রীরাও মানুষ হতে শেখে, তাহলেই সার্থক।”

অভি বাইরে যতই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, ভিতরে ততই এক নিঃশব্দ শূন্যতা ঘিরে রাখে। সৃজিতার স্মৃতি মুছে যায়নি। তবু তিনি শিখেছেন—আবেগকে কলমে রূপান্তরিত করতে। সেই কলমই তার বেঁচে থাকার ভরসা।

অন্যদিকে সৃজিতা—
দিব্যেন্দুর ব্যবসা দিনে দিনে আরও বড় হচ্ছে, অথচ সংসারে তার উপস্থিতি কমছে। অফিসের কাজ, পার্টি, বিদেশ সফর—এসবই এখন তার নিত্যসঙ্গী। সৃজিতা সারাদিন সন্তানের হাসি-কান্নায় ভরে থাকলেও ভেতরে জমে ওঠে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা।

রাতের নির্জনতায় অনেকবার তার মনে পড়ে অভির মুখ।
যখনই সংবাদপত্র বা টিভিতে অভির নাম উঠে আসে, বুকের ভেতর যেন একটা কাঁপন ছড়িয়ে পড়ে।
“যদি আমি অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম?”
প্রশ্নটা তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে।

একদিন সন্ধ্যায়—
সৃজিতা মেয়েকে নিয়ে বাগবাজারের ঘাটে হাওয়া খেতে গিয়েছিল। সেখানে হঠাৎ এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে গল্পের ফাঁকে বলে—
“এই তো, কাল বইমেলায় অভিনব গুপ্তর নতুন গল্পগ্রন্থের উদ্বোধন ছিল। ভিড় সামলানোই দায় হয়ে গিয়েছিল।”

সেই মুহূর্তে সৃজিতার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যায়।
সে ভাবে, “অভি কি সত্যিই এত বড় হয়ে গেছে? অথচ আমি তাকে ছেড়ে এক ‘নিশ্চিত ভবিষ্যৎ’-এর পেছনে ছুটেছিলাম।”

অন্যদিকে অভিও বইমেলার একদিন হঠাৎ দেখতে পায়—
দূরে ভিড়ের মধ্যে সৃজিতাকে। কোলে ছোট্ট মেয়ে।
চোখাচোখি হয় না, কিন্তু অভি স্পষ্ট বুঝতে পারে—
এটাই সেই সৃজিতা, যে একসময় তার কবিতা শুনে চোখ ভিজিয়েছিল।

অভি কিছু বলেনি, এগিয়েও যায়নি।
কিন্তু বাড়ি ফিরে খাতার পাতায় লিখে চলে—
"কিছু সম্পর্ক রেলস্টেশনের মতো, যেখানে ট্রেন থামে, মানুষ নামে, আবার চলেও যায়। তবু সেই প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকে অসমাপ্ত গল্পের প্রতিধ্বনি।"

চলবে....

পর্ব ২: নতুন অধ্যায়ের সূচনা

সময় থেমে থাকে না। বর্তমানে সৃজিতা দিব্যেন্দুর সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর সৃজিতার পরিবারের চাপে এবং দিব্যেন্দুর দৃঢ় আগ্রহে অবশেষে বিয়ের দিন ঠিক হয়। উত্তর কোলকাতার একটি ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে জমকালো আয়োজন—আত্মীয়-স্বজন, আলো, হাসি, কোলাহলে ভরে ওঠে সৃজিতার জীবনের নতুন অধ্যায়।

অভি দূর থেকে সব খবর পায়, যদিও কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। ভেতরে যন্ত্রণা তীব্র হলেও বাইরে শান্ত, যেন কিছুই ঘটেনি। কেবল একা রাতে খাতার পাতায় আঁকড়ে ধরে লিখে চলে—নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায়।

বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস সৃজিতা যেন নতুন স্বপ্নের ভিতরে। দিব্যেন্দুর সচ্ছল জীবনযাপন, গাড়ি-বাড়ি, পরিচিত মহল—সবকিছুতেই নতুন অভিজ্ঞতা। বাবা-মা তৃপ্ত, আত্মীয়রা প্রশংসায় ভরিয়ে দেয়।

এক বছরের মাথায় সৃজিতা এক কন্যাসন্তানের মা হয়। সন্তানের মুখ দেখে মনে হয় জীবন পূর্ণতা পেয়েছে। দিব্যেন্দুও খুশি, তবে তার ব্যস্ত ব্যবসার কারণে অধিকাংশ সময় সে অফিসেই ডুবে থাকে।

এই সময়ে অভি সাহিত্য জগতে ধীরে ধীরে নিজের নাম তৈরি করতে শুরু করেছে। টিউশনের পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা লিখে পাঠাচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকায়। একদিন তার একটি গল্প প্রথম সারির পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
পাড়ার মানুষ গর্বিত, মা-বাবা আনন্দে আপ্লুত, ছোট ভাই ক্যাম্পাসে গিয়ে দাদার নাম বলতেই সম্মান পায়।

অভি বুঝতে পারে—হারানো ভালোবাসা হয়তো আর ফেরানো যাবে না, কিন্তু নিজেকে গড়ে তোলার পথে কোনও থামা নেই।

সন্তান জন্মের প্রায় দেড় বছর পর, যখন সংসারের নতুনত্ব ফিকে হতে শুরু করে, সৃজিতার মনে কিছু প্রশ্ন জেগে ওঠে।
দিব্যেন্দুর ব্যস্ততা আরও বেড়েছে, প্রায়শই রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরে। সৃজিতা সারাদিন সন্তানের যত্নে ব্যস্ত থাকলেও নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা টের পায়।

সেই সময় হঠাৎই একদিন চোখে পড়ে—
পত্রিকায় বড় শিরোনামে লেখা:
“অভিনব গুপ্ত: নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিক মুখ।”

সৃজিতা স্থির হয়ে যায়।
সে ভাবে—
“এ কি সেই অভি, যে একসময় আমার হাত ধরে বলেছিল—‘তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি?’
আমি কি ভুল করেছিলাম?”

চলবে....

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ১: আলো-ছায়ার গল্প পটভূমি: কোলকাতা

কোলকাতার এক পুরনো কিন্তু সম্মানজনক পাড়ায়, উত্তর কোলকাতার শ্যামবাজারের কাছে একটা ভাড়াবাড়িতে থাকে অভিনব গুপ্ত। বয়স ৩০ এর কোটায়। পাড়ায় অভি নামেই পরিচিত। এম.এ. পাশ করেছে বাংলা সাহিত্য নিয়ে, কিন্তু চাকরির দেখা মেলেনি এখনও। তবু থেমে নেই সে—প্রাইভেট টিউশনির মাধ্যমেই দিন চলে, কখনো ৪টা, কখনো ৫টা টিউশন। সেই আয়ে নিজের খরচ তো মেটেই, কখনো কখনো বাবার ওষুধ, মায়ের বাজার কিংবা ছোট ভাইয়ের কলেজের ফিসটাও সামলাতে হয়। তার উপর ছোট ভাইয়ের এবার ফাইনাল ইয়ার!!

অভির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্যতম ছিল সৃজিতা সেন। ক্লাস এইট থেকেই সে পড়ছে অভি স্যারের কাছে। থাকে উত্তর কোলকাতার বাগবাজারে, এক স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে—বাবা সরকারি চাকরি করেন - বয়স পঞ্চাশের দোরগোড়ায়, মা গৃহিণী - বছর পঁয়তাল্লিশ হবে, সংসারটা সুশৃঙ্খলভাবে চলে। বাড়িতে নিয়মিত ইংরেজি পত্রিকা আসে, সপ্তাহে একদিন সিনেমা দেখতে যাওয়া হয়, নতুন ফোন কেনা যায়—তবে খুব বেশি বাড়াবাড়ি নয়।

সৃজিতা সদ্য মাধ্যমিক শেষ করে ইলেভেনে উঠেছে। খুব মেধাবী না হলেও একরকম মনোযোগী বছর সতেরো বয়স, আর অভি স্যারের প্রতি তার এক ধরণের ভালোলাগা বা ভালোবাসা আছে ক্লাস টেনে ওঠার পর থেকেই। অভির চোখেমুখে থাকা নিষ্ঠা, সংগ্রাম, আর মানুষের প্রতি সম্মান তাকে আকর্ষণ করেছিল। তাই বাড়িতে নতুন পঠন-পাঠনের টিউশনের নাম করে, টিউশনের বাইরেও কিছু কথা চালাচালি শুরু করে, প্রেমের আদান-প্রদান শুরু হয় সৃজিতার বাবা-মায়ের অগোচরে। পাশাপাশি রাস্তায় দেখা হলে দাঁড়িয়ে হালকা হাসির আদানপ্রদান, মাঝে মাঝে কবিতার লাইন পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপে—সবকিছুই ছিল কিশোরী মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্ত। যা পরিণতি পায় প্রেমে। উভয়েই উভয়ের প্রেমে পড়ে। মন আদান প্রদান হয়।

কিন্তু বছর দুয়েক বাদে কলেজে ওঠার পর থেকেই ধীরে ধীরে বাস্তবতা চেপে ধরে। সৃজিতার পরিবার চায় সে ভবিষ্যতে স্থির হোক, ভালো চাকরি করুক, আর এখন থেকেই এমন একজন জীবনসঙ্গী ঠিক করুক যার ভবিষ্যৎ স্থির, উপার্জন নিশ্চিত। অভির সংগ্রামী জীবন দেখে তাদের নিজেদের মধ্যে কখনও কখনও মেয়ের জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবলেও, তাদের মনে সন্দেহ জাগে—“ভালো মানুষ তো, কিন্তু ওর ভবিষ্যতটা কোথায়?”

সৃজিতা কলেজে সেকেন্ড ইয়ারের শেষের দিকে পড়ার সময়েই আসে দিব্যেন্দু মুখার্জি, অবিবাহিত, বয়স প্রায় ৪০, একজন সফল ব্যবসায়ী—ব্যবসা করে সল্টলেকের একাধিক ফ্ল্যাট ও অফিসের মালিক। তিনি সৃজিতার বাবার পরিচিত, প্রায়শই তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। ব্যবসায় অধিক মনোযোগের কারণে বিয়ে আর করা হয় ওঠেনি। ধীরে ধীরে দিব্যেন্দুর ঝকঝকে উপস্থিতি, সচ্ছল জীবনযাত্রা, অভিজ্ঞতা—এসবই সৃজিতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সে ভাবে, “জীবনটা কি এত সহজে সুন্দর হতে পারে?” সে দিব্যেন্দুর প্রেমে পড়ে যায়।

অভি এই পরিবর্তন বুঝতে পারে। সৃজিতা ধীরে ধীরে টিউশন বাদ দিতে শুরু করে, ফোনে কথা কমে যায়, একদিন হোয়াটসঅ্যাপে একটাই মেসেজ: “অভি, আমি আর টিউশন নেব না। ধন্যবাদ সবকিছুর জন্য। তুমি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।”

অভি বোঝে, ভালোবাসা কেবল আবেগ দিয়ে হয় না, সমাজ ও বাস্তবতার কঠিন হিসাব-নিকাশে অনেক কিছুই মিশে যায়। সে চুপচাপ সেই পুরনো কারখানার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায়—যেখানে একদিন সৃজিতা ও অভি একে অপরকে বলেছিলো, “তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি।”

চলবে....

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...