অভির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্যতম ছিল সৃজিতা সেন। ক্লাস এইট থেকেই সে পড়ছে অভি স্যারের কাছে। থাকে উত্তর কোলকাতার বাগবাজারে, এক স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে—বাবা সরকারি চাকরি করেন - বয়স পঞ্চাশের দোরগোড়ায়, মা গৃহিণী - বছর পঁয়তাল্লিশ হবে, সংসারটা সুশৃঙ্খলভাবে চলে। বাড়িতে নিয়মিত ইংরেজি পত্রিকা আসে, সপ্তাহে একদিন সিনেমা দেখতে যাওয়া হয়, নতুন ফোন কেনা যায়—তবে খুব বেশি বাড়াবাড়ি নয়।
সৃজিতা সদ্য মাধ্যমিক শেষ করে ইলেভেনে উঠেছে। খুব মেধাবী না হলেও একরকম মনোযোগী বছর সতেরো বয়স, আর অভি স্যারের প্রতি তার এক ধরণের ভালোলাগা বা ভালোবাসা আছে ক্লাস টেনে ওঠার পর থেকেই। অভির চোখেমুখে থাকা নিষ্ঠা, সংগ্রাম, আর মানুষের প্রতি সম্মান তাকে আকর্ষণ করেছিল। তাই বাড়িতে নতুন পঠন-পাঠনের টিউশনের নাম করে, টিউশনের বাইরেও কিছু কথা চালাচালি শুরু করে, প্রেমের আদান-প্রদান শুরু হয় সৃজিতার বাবা-মায়ের অগোচরে। পাশাপাশি রাস্তায় দেখা হলে দাঁড়িয়ে হালকা হাসির আদানপ্রদান, মাঝে মাঝে কবিতার লাইন পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপে—সবকিছুই ছিল কিশোরী মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্ত। যা পরিণতি পায় প্রেমে। উভয়েই উভয়ের প্রেমে পড়ে। মন আদান প্রদান হয়।
কিন্তু বছর দুয়েক বাদে কলেজে ওঠার পর থেকেই ধীরে ধীরে বাস্তবতা চেপে ধরে। সৃজিতার পরিবার চায় সে ভবিষ্যতে স্থির হোক, ভালো চাকরি করুক, আর এখন থেকেই এমন একজন জীবনসঙ্গী ঠিক করুক যার ভবিষ্যৎ স্থির, উপার্জন নিশ্চিত। অভির সংগ্রামী জীবন দেখে তাদের নিজেদের মধ্যে কখনও কখনও মেয়ের জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবলেও, তাদের মনে সন্দেহ জাগে—“ভালো মানুষ তো, কিন্তু ওর ভবিষ্যতটা কোথায়?”
সৃজিতা কলেজে সেকেন্ড ইয়ারের শেষের দিকে পড়ার সময়েই আসে দিব্যেন্দু মুখার্জি, অবিবাহিত, বয়স প্রায় ৪০, একজন সফল ব্যবসায়ী—ব্যবসা করে সল্টলেকের একাধিক ফ্ল্যাট ও অফিসের মালিক। তিনি সৃজিতার বাবার পরিচিত, প্রায়শই তাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। ব্যবসায় অধিক মনোযোগের কারণে বিয়ে আর করা হয় ওঠেনি। ধীরে ধীরে দিব্যেন্দুর ঝকঝকে উপস্থিতি, সচ্ছল জীবনযাত্রা, অভিজ্ঞতা—এসবই সৃজিতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সে ভাবে, “জীবনটা কি এত সহজে সুন্দর হতে পারে?” সে দিব্যেন্দুর প্রেমে পড়ে যায়।
অভি এই পরিবর্তন বুঝতে পারে। সৃজিতা ধীরে ধীরে টিউশন বাদ দিতে শুরু করে, ফোনে কথা কমে যায়, একদিন হোয়াটসঅ্যাপে একটাই মেসেজ: “অভি, আমি আর টিউশন নেব না। ধন্যবাদ সবকিছুর জন্য। তুমি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।”
অভি বোঝে, ভালোবাসা কেবল আবেগ দিয়ে হয় না, সমাজ ও বাস্তবতার কঠিন হিসাব-নিকাশে অনেক কিছুই মিশে যায়। সে চুপচাপ সেই পুরনো কারখানার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যায়—যেখানে একদিন সৃজিতা ও অভি একে অপরকে বলেছিলো, “তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি।”
চলবে....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন