রবিবার সকাল।
আকাশটা যেন কেমন ধূসর। হালকা কুয়াশার মতো ছায়া পড়েছে গলিপথে। অভির মনে হচ্ছে—আজকের দিনটা অন্যরকম।
গতরাতে ঐশীর বুকে মাথা রেখে সব খুলে বলার পর অনেকটা হালকা লাগছে। কিন্তু তবুও মনে একটা চাপা কাঁপুনি আছে।
মোবাইলের স্ক্রিনে আবার ভেসে উঠল সেই মেসেজ—
“অভি, কাল দুপুরে কফি হাউসে দেখা করো। প্লিজ।”
অভি কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
মা অভির দিকে তাকিয়ে বললেন —
“অভি, আজ রবিবার। সকাল সকাল চা খেয়ে নে, তারপর তোর কাজ নিয়ে ভাবিস।”
অভি চুপচাপ মাথা নাড়ল।
দুপুর নাগাদ ঐশী এল। হাতে কয়েকটা বই।
“এগুলো কাল লাইব্রেরী থেকে এনেছি, তোমার কাজে লাগবে ভাবলাম।”
অভি তার হাত থেকে বইগুলো নিয়ে টেবিলে রাখলো। তারপর একটু দ্বিধা করে বলল—
“ঐশী, আজ হয়তো আমাকে কফি হাউসে যেতে হবে।”
ঐশী শান্ত মুখে অভির দিকে তাকালো।
“হ্যাঁ, যাও। তবে মনে রেখো—তুমি যেখানেই যাও না কেন, তোমার ঘর এখানে, আমার কাছে।”
অভি মৃদু হাসল।
ঐশীর এই নির্ভরতা তাকে নতুন সাহস দিলো।
অভি দুপুরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুটি প্রকাশনীর মালিকের বাড়িতে গিয়ে তাদের সাথে কিছু হালকা কথাবার্তা সেরে কফি হাউস যাবে ঠিক করলো। সেই মতো বেরিয়ে গেলো।
ঐশী সেখানে সন্ধ্যে পর্যন্ত কাটিয়ে অভির সাহিত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এগিয়ে রেখে বাড়ি ফিরবে ঠিক করলো।
এদিকে রবিবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল - কফি হাউস।
সন্ধের আলো নেমে আসছে। বাইরে ব্যস্ততা, ভেতরে গ্লাসের টুংটাং শব্দ, টেবিল জুড়ে চেনা অচেনা মুখ।
অভি ঢুকতেই দেখতে পেল—এক কোণে বসে আছে সৃজিতা।
মাথার উপরে কালো ফ্রেমের সানগ্লাস, খোলা পরিপাটি চুল কাঁধ পর্যন্ত, পরনে বেশ রঙিন শাড়ি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক।
কিন্তু চাহনিতে সেই পুরোনো অস্থিরতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত চাপা টান।
অভি ধীরে গিয়ে চেয়ারে বসল। সৃজিতার ঠোঁটে সাজানো একরকম কৃত্রিম হাসি। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। সৃজিতা নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সৃজিতা শুরু করলো - "সেই দুপুর থেকে বসে আছি। বেশ বুঝতে পারছি টানটা আর আগের মতো নেই। অবশ্য তুমি তো এখন সেলিব্রিটি। প্রেমের সেই দিনগুলোতে তুমি যেমন আমার জন্য অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করতে, আজ মনে হলো তার প্রতিশোধ নিলে, আমিও অনুভব করলাম, তোমাকে অতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য তোমার কিরকম লাগতো। আমি সত্যিই দুঃখিত সেই দিনগুলোর জন্য।"
অভি - "ঠিক সেটা নাহ্, আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো।"
সৃজিতা - "স্বাভাবিক আমি এখন তোমার কাছে গুরুত্বহীনই বটে।"
ইতিমধ্যে ওয়েটার এলো অর্ডার নিতে। সৃজিতা অভির দিকে তাকিয়ে - "তুমি কি সেই পুরনো রোবাস্টা, নাকি সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়েছে?"
অভি - "একই, আমি সময়ের সাথে নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারিনি।"
কথাটা সৃজিতার মনে খুব বিধলো, কিন্তু কিছু বললো না।
সৃজিতা (ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে) - "একটা ক্যাপুচিনো রোবাস্টা আর একটা কোল্ড কফি।"
সৃজিতা অবশেষে বলল—
“অভি, তুমি একদম বদলে গেছো। আগে তোমাকে এভাবে দেখিনি। তোমার চোখে এখন আত্মবিশ্বাস, তোমার মুখে সেই হারানো দীপ্তি ফিরে এসেছে। এখন সবাই তোমার নাম করছে। জানো, আমি… আমি গর্বিত যে তোমাকে কোনোদিন আমার বলতে পেরেছিলাম।”
অবশেষে কফি এসে গেল।
অভি কফিতে এক চুমুক দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল—
“ধন্যবাদ। কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ এই ডাক কেন?”
সৃজিতা একটু কেঁপে উঠল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
“আমি ভুল করেছি অভি। আমি ভেবেছিলাম টাকাপয়সা, আড়ম্বরেই সুখ লুকিয়ে আছে। কিন্তু বুঝতে পারিনি… তোমাকে হারিয়ে আমি আসলে নিজেকেই শূন্য করে ফেলেছি।”
অভি চোখ নামিয়ে কফির কাপে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
“যখন কিছুই ছিল না আমার, তখন তুমি আমার পাশে থাকতে পারলে না। আজ আমি যখন একটু উঠে দাঁড়িয়েছি, তখন তুমি আবার ফিরে আসতে চাইছো। এটা কি ন্যায়সঙ্গত?”
সৃজিতার চোখ ভিজে এল।
“আমি জানি, তোমাকে আর পাবো না। তবুও এই একবার বলতে চেয়েছিলাম—আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”
অভি শান্ত গলায় উত্তর দিল—
“সৃজিতা, তুমি তোমার সংসার যেরকম চেয়েছিলে সেরকম পেয়েছো, এমনকি সবকিছু উপভোগ করেছো। এখন সব সুযোগ সুবিধা হাতের কাছে পাচ্ছো। তোমার কিসের অভাব আজ? তোমার স্বামী, তোমার মেয়ে—ওরাই তোমার সত্যি। আমি এখন তোমার অতীত। আমার কাছে আজ অন্য এক আলো এসেছে, যার নাম ঐশী। আর তুমি আমায় ছুঁড়ে ফেলে না দিলে, আজও হয়তো তোমারই থাকতাম। আমাকে ছেড়ে যাকে বিয়ে করেছিলে তার সাথেও তো অনেকটা সময় তুমি চুটিয়ে প্রেম করেছো, তারপর বিয়ে করেছো। তখন কি একবারও আমার কথা মনে পড়েছিলো? কি করছি, কিভাবে দিন কাটাচ্ছি! এটা তো মিথ্যা নয়।”
সৃজিতা নীরব হয়ে রইল।
চারপাশের কোলাহলের মাঝেও যেন এক নিস্তব্ধতা ভেসে উঠল। তারপর সেই কথা খুব চালাকির সাথে এড়িয়ে বললো
“মনে আছে অভি, সেদিন তোমার কাছে ক্লাস করতে গিয়েছিলাম, তুমি বলেছিলে—‘তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি।’ তখন আমি উচ্চমাধ্যমিকের দোরগোড়ায়। আমি এখনও তোমার চোখে তাকালে সেই কথাগুলো শুনতে পাই। বলো, সত্যিই কি একেবারেই কিছু বাকি নেই তোমার ভেতরে?”
অভি এবার চোখ তুলে তাকাল। ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে।
“তুমি এখন কেন এসব বলছো? যখন আমার জীবনটা ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছিল, তোমার ভালোবাসা হারিয়ে আমি তখন অথৈ জলে, জীবনের চারিদিক অন্ধকার, আমি তখন দিশেহারা, কোনদিকে গেলে সঠিক পথ পাবো ভেবে পাচ্ছিনা; তখন তো তুমি চলে গেলে দিব্যেন্দু দা'র গাড়ি-বাড়ি, টাকার কাছে। তখন তো তোমার এসব ভালোবাসা মনে পড়েনি। যখন আমার কিছুই ছিল না, তখন তো তোমার চোখে আমার কোনো মূল্য ছিল না।”
সৃজিতা একটু থেমে গলাটা নরম করল এবং পুরানো প্রেমের স্মৃতিকে আরও একটু উস্কে দেওয়ার চেষ্টায় মগ্ন হলো।
“অভি, তুমি কি ভুলে গেছো সেই দিনগুলো? যখন মাধ্যমিক পাশ করে সদ্য ইলেভেনে উঠলাম, তখন আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে গিয়ে বলেছিলাম, "স্যার আমি আপনার জন্যই এত ভালো রেজাল্ট করেছি, মানছি আমি আপনার থেকে অনেক ছোট, তবুও এখন কি আমি আপনার মন পাওয়ার যোগ্য হতে পেরেছি?" কিছুক্ষণ থেমে সৃজিতা কফিতে একটু চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো - "তখন কিন্তু তুমিই হাঁটু গেড়ে বসে প্রথম আমাকে একটা লাল গোলাপ আর ক্যাটবেরি দিয়েছিলে, আর হাত ধরে বলেছিলে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি! মনে পড়ে সে কথা?" তখন যদি তুমি না বলতে, আমি কিন্তু আর এগোতাম না; আবার বৃষ্টির দিনে একদিন তুমি বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলে, সদ্য কলেজে ওঠা আমি তখন কলেজ থেকে ভিজতে ভিজতে ফিরছিলাম, তুমি এগিয়ে এসে ছাতাটা ধরে আমাকে ভিজতে দাওনি! আমি কি ভুলতে পেরেছি সেসব?”
অভি চুপচাপ। চোখ নামিয়ে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে আছে। স্মৃতির ধাক্কা তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন ধরালেও মুখ শক্ত রেখেছে।
সৃজিতা কিছুটা অস্থির হয়ে উঠে বলল—
“আমি ভুল করেছি, অভি। আমি ভেবেছিলাম টাকা, ঐশ্বর্য, নিরাপত্তাতেই সুখ লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই সংসারে আমি শুধু শূন্যতা পেয়েছি। দিব্যেন্দু দিন রাত ব্যস্ত থাকে, মেয়েটাকে বড় করছি একাই। অথচ তুমি… তুমি আজ আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করলে—মানুষ নিজের শক্তিতে কেমন করে উচ্চতায় উঠতে পারে। আর আমি? আমি শুধু তোমাকে হারিয়ে নিজের সর্বনাশ করেছি।”
একটু থেমে, কণ্ঠ ভিজিয়ে আবার বলল—
“অভি, আমি জানি আমি তোমাকে আর পাবো না। তবুও… আজ আমি আবার বলতে চাই, আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। যদি একটুও তোমার মনে আমার পুরোনো অভির অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে তুমি সেটা অনুভব করবে।”
অভির বুকের ভেতর যেন পুরোনো প্রেমের হাওয়া এক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সৃজিতার সেই কাঁচা বয়সের দিনগুলো — মনে পড়ছে ক্লাস এইট থেকে তার কাছে পড়তে আসা এক ছাত্রী কিভাবে তার প্রেমিকা হয়ে উঠলো, মনে পড়ে গেলো ক্লাস টেনে ওঠার পরই সৃজিতার তাকে প্রথম প্রেমপত্র দেওয়ার কথা। বয়সে অনেক ছোট বলে সেদিন খুব ধমক দিয়েছিলো সৃজিতাকে। সেদিন, ও খুব কেঁদেছিলো। তারপর ধীরে ধীরে কবে যে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসা, মনে পড়ে না আর। ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় গঙ্গার ধারে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্ন বলা, বৃষ্টির ভেজা বিকেল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে আবার টেনে নিতে চাইছে তাকে পুরোনো ঘূর্ণিতে।
কিন্তু অভি গভীর শ্বাস নিয়ে গলাটা শক্ত করল।
“না সৃজিতা। তুমি ভুল করছো। আজ আমি অন্য মানুষ। হ্যাঁ, অতীত ভুলিনি, কিন্তু আজকের আমি সেই অতীতের অভির কাছে ফিরে যেতে পারি না। আমার আজকের জীবনে ঐশী আছে—সে আমাকে যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে আগলে রেখেছে, তুমি সেটা কখনও করোনি।”
সৃজিতা কাঁপা গলায় বলল—
“তাহলে তুমি সত্যিই আর একটুও আমায় অনুভব করো না? তুমি কি একদমই ভুলে গেলে আমাকে?”
অভি শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল—
“ভুলিনি। কিন্তু সেই স্মৃতি এখন শুধুই অতীত। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আছে ঐশীর হাত ধরে। তোমার কাছে আছে তোমার সাজানো সংসার - দিব্যেন্দু দা, তোমার মেয়ে, তোমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি - আভিজাত্যে ভরপুর। সমাজে দিব্যেন্দু দা'র স্ত্রী হিসাবে তোমার একটা বিশাল সন্মান আছে। দয়া করে তোমার নিজের পৃথিবীটা ভেঙো না।”
সৃজিতার চোখে জল এসে গেল। ঠোঁট কাঁপছে।
সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু অভি আর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। সৃজিতা বুঝলো অভিকে আর তাদের পুরানো প্রেমের কথা বলে গলানো সম্ভব না।
অভির চোখের গভীরে অদ্ভুত এক অভিমান, কিন্তু গলায় দৃঢ়তা—
“বিদায় রুমা।”
অভি বেরিয়ে গেল কফি হাউস থেকে। বাইরে হাওয়ায় ভেসে আসছিল ভিড়ের শব্দ, গাড়ির হর্ন। কিন্তু তার ভেতরে যেন এক নতুন শান্তি।
অন্যদিকে, সৃজিতা চুপচাপ টেবিলে বসে রইল, চোখের সামনে ধোঁয়া ওঠা অভির কফির কাপ—সৃজিতা চুপচাপ কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। যেন তার নিজের শূন্য জীবনের প্রতিচ্ছবি।
চলবে…