মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল।

অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ—

“অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।”

— সৃজিতা।

অভি এবার বিরক্ত হলো। সে ঠিক করল আর কোনো উত্তর দেবে না। ফোনটা সাইলেন্টে রেখে হেঁটে চলে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই রাস্তায় একটা কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ির ভেতর থেকে সৃজিতা। মুখে কৃত্রিম হাসি—

“অভি, প্লিজ… পাঁচ মিনিট সময় দাও।”

অভি থমকে দাঁড়াল এবং বিস্মিত হয়ে -

"তুমি কীকরে জানলে আমি আজ এই কলেজে এসেছি? স্পাই লাগিয়েছো আমার পেছনে?"

"একজন বিখ্যাত ব্যক্তির সম্মন্ধে জানার জন্য কোনও স্পাই লাগেনা অভি!" - সৃজিতা এক নিশ্বাসে বলে গেলো।

অভি একটু বিরক্ত হয়ে -

“তুমি কি আর বুঝতে পারছো না, আমি এসব চাই না?”

সৃজিতা গাড়ি থেকে নেমে এলো। চারপাশে লোকজন, তাই অভি খুব রুক্ষও হতে পারল না।

সৃজিতা নিচু গলায় শ্লেষাত্মক হাসিতে বলল—

“তোমার নতুন পছন্দের মানুষ যদি জেনে যায় সেই ভয় পাচ্ছো? আমি নিজে কিছু বলবো না, তবে অন্য কোনও ভাবে যদি জেনে যায়, তবে আমাকে দোষ দিওনা কিন্তু।"

একটু থেমে সৃজিতা আবার বলতে শুরু করলো - "তবে আমার কাছে তুমি আজও সেই অভি। আমার কাছে তোমার স্মৃতি মরেনি। জানো, আমার জীবনটা বাইরে থেকে যত সুন্দর দেখাক না কেন, ভেতরে আমি একেবারে একা। দিব্যেন্দু আমাকে সময় দেয় না, শুধু ব্যবসা আর পার্টি। এমনকি… আমাদের সম্পর্কও অনেকদিন ভেঙে গেছে। আমি শুধু মেয়েটার জন্য সংসার টেনে নিচ্ছি।”

অভি শান্ত স্বরে বলল—

“এটা শুনে আমি কি করতে পারি, তোমার সংসার, তোমার পরিবার তুমি কিভাবে ট্যাকল করবে, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। আর বারবার আমার কাছে এসে তুমি ঠিক কি চাইছো বলোতো? আবার আমাকে জড়িয়ে নিজের শূন্যতা ভরতে?”

সৃজিতা তার হাত ধরতে গেলো—

“আমি শুধু চাই তুমি মাঝে মাঝে আমার সাথে থেকো। পুরোনো বন্ধু হিসেবে হলেও। আমার শূন্য জীবনে একটু আলো আসুক। আমি জানি, তোমার একজন নতুন সখী এসেছে জীবনে, তাকে নিয়ে আমার কোনও আগ্রহও নেই। আর আমি সেটা ছিনিয়ে নিতেও চাই না। তবে আমি কথা দিচ্ছি, আমার আর তোমার সম্পর্ক আর মাঝে মাঝে মিট করার কথা ওই মেয়েটা আমার কাছ থেকে অন্তত জানবে না।”

অভি এবার হাতটা সরিয়ে নিল।

“না, তুমি ভুল ভাবছো। আমি ঐশীর কাছে আজ স্বচ্ছ, তার কাছে কিছু লুকোনো নেই। তুমি যদি সত্যিই ভেঙে পড়ো, সেটা তোমার নিজের সিদ্ধান্তের ফল। আমার কাছে এখন শুধু ঐশী।”

সৃজিতা হালকা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল—

“অভি… তুমি কি ভুলে গেছো, আমি একদিন তোমাকে আমার সমস্ত স্বপ্নের ভেতর রেখেছিলাম? তুমি যদি সত্যিই আমাকে একেবারেই ভুলে যাও, তবে আমি ভেঙে পড়ব।”

অভি রাগ চেপে বলল—

“তুমি বুঝছো না সৃজিতা, এভাবে কাছে আসতে চাইলে তুমি শুধু আমার সম্পর্কই নয়, তোমার নিজের সংসারও ভেঙে ফেলবে। তোমার স্বামী, তোমার মেয়ে—তাদের কথা একবারও ভাবছো না? আর এভাবে কারোর মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পর ভবিষ্যতে তাকে বা তার মনকে জোরজবরদস্তি ফেরত পাওয়া যায়না।”

অভি এবার দ্রুত হেঁটে নিজের গাড়িতে বসে বেরিয়ে গেলো।

সৃজিতা দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার পাশে, ঠোঁটে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি। নিজের মনে ফিসফিস করে বলল—

“ঐশী… তুমি ভেবেছো আমাকে হারিয়ে জিতে গেছো? ভুল করছো মেয়ে। অভি আমার ছিলো, এখনও আমি তাকে আমার ইচ্ছামতো টানতে পারি। যেকোনোভাবে।”

চলবে....

পর্ব ৩৩: আশ্রয়ের আলো

রবিবার রাত আটটা।
অভি ক্লান্ত মুখে বাড়ি ফিরল। দরজায় কলিং বেল বাজালো। 
মা এসে দরজা খুলে দিলো আর বললো - ঐশী এখনও আছে। ঘরে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
অভি ধীরে জুতো খুলে রাখতে রাখতে বললো - "ও এখনও বাড়ি যায়নি? রাত আটটা বাজে,  কাল তো ওর কলেজ আছে!"
 
ঠিক তখনই ঐশীও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। উৎকণ্ঠা মিশ্রিত কন্ঠে বললো - "হ্যাঁ, আমি বাড়ি যাবো। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।"

মা বললো - "ঠিক আছে, অভি তুই ওকে ওর বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসবি।"

অভি - "ঠিক আছে মা।"

ঐশী - "আরে নাহ্ কাকিমা, আমি একাই চলে যেতে পারবো, ও অনেক ক্লান্ত হয়ে এসেছে, একটু রেস্ট নিক।"

মা - "নাহ্ মা, তুমি পাকামি কোরো না, আমি যেটা বলেছি, সেটাই ও করবে। আমি তোমাকে একলা ছাড়তে পারবো না। ও যতই ক্লান্ত হোক, এটা এখন ওর ডিউটি, নিজের হবু স্ত্রীয়ের দায়িত্ব নেওয়া।"

ঐশীকে তার হবু শাশুড়ী যে এত আপন ভেবে নিয়েছে, সেটা ভেবে ঐশী আরও নিশ্চিন্ত হলো।

মা তার নিজের ঘরে যেতে যেতে অভিকে বললো -
"ফ্রেশ হয়ে ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে ঐশীকে দিয়ে আসবি।"

অভি -
"হ্যাঁ মা।"

এদিকে ঐশীর চোখে একরাশ উৎকণ্ঠা। অভির হাত ধরে অভির ঘরে যেতে যেতে -
“এত দেরি হলো, সব ঠিক আছে তো?”

অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বললো -
“হ্যাঁ… সব ঠিক আছে।"

ঐশী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সে শুধু অভির পিছন পিছন অভির ঘরে টেনে বসিয়ে দিলো। রান্নাঘর থেকে গরম দুধ এনে তার সামনে ধরল।
“এই নাও, আগে এটা খাও। তারপর যা বলতে ইচ্ছে করে বলবে।”

অভি তাকিয়ে রইল ঐশীর দিকে।
মনে হলো—এই মেয়েটার চোখের ভেতরেই তার সমস্ত নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে।

দুধটা এক চুমুক খেলো অভি।
তারপর আস্তে আস্তে সব খুলে বলল—কফি হাউসে সৃজিতার সঙ্গে দেখা, পুরোনো স্মৃতির কথা, কেমন করে সে আবার টানতে চাইছিলো অভিকে পুরোনো ঘূর্ণিতে।

সব শুনে ঐশী একটুও বিচলিত হলো না।
শুধু মৃদু হেসে বলল—
“ও চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তুমি আজ যেটা, সেটা তো আর অকারণে হয়নি। তবে তুমি জানো তো অভি, তোমার জায়গাটা কোথায়?”

অভি বিস্মিত চোখে তাকাল।
“কোথায়?”

ঐশী হাত বাড়িয়ে অভির মাথা টেনে নিলো তার বুকে।
“এখানে।”

অভির বুকের ভেতর চাপা কাঁপনটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল।
সে নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
“ঐশী, তুমি না থাকলে আমি আজ সত্যিই ভেসে যেতাম। পুরোনো স্মৃতি বড় কষ্ট দেয়। কিন্তু তুমি আমার ভেতরে নতুন এক আলো জ্বেলে দিয়েছো।”

ঐশী চুপচাপ ওর কপালে হাত রাখল।
“তাহলে আর ভাবনা কিসের? তোমার অতীত তোমাকে কাঁদাতে পারে, কিন্তু বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আমি তোমার জন্য সাজিয়ে রাখবো। তুমি শুধু আমার ওপর ভরসা রেখো।”

অভি চোখ বুজে ঐশীর হাত শক্ত করে ধরল।
মনে হলো—এটাই তার একমাত্র সত্যিকারের আশ্রয়।

অভি মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিলো, ওর ঐশীকে বললো - "এবার চলো তোমায় ছেড়ে দিয়ে আসি।"

ঐশী - "কি দরকার ছিলো গো!"

অভি - "না, আমি তোমাকে আর কোনও কিছুতেই হারাতে চাইনা ঐশী; রাত হচ্ছে, আর মা স্ট্রিক্টলি বলে দিয়েছে, এরপর তোমার আর কোনও আপত্তি থাকতে পারেনা।"

ঐশী - "ঠিকাছে বাবাহ্, আমি আর মানা করবো না তোমায়।"

অভি নিজের গাড়ি বার করলো, সামনের সিটে পাশেই বসলো ঐশী। সিট বেল্ট পড়ে নিলো দুজনে। তারপর মিনিট দশেকের নীরবতা। ইতিমধ্যে ঐশীর বাড়ি পৌঁছে গেলো। ঐশী নেমেই দেখলো আশেপাশে কেউ দেখছে কিনা, তারপর অভির দিকে তাকিয়ে বললো - "টাটা," তারপর মৃদু হেসে মৃদু কন্ঠে, "কাল আসবো শ্বশুরবাড়ি কলেজ ফেরত!!"

অভিও হেসে ফেললো আর হ্যাঁ সূচক সম্বোধন করে গাড়ি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

অভি বাড়ি ফিরে, বাকিদের সাথে রাতের খাওয়ার খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।

বাইরে রাত গভীর হচ্ছে। জানালা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে ধীরে ধীরে। কিন্তু ভেতরে, অভির জীবনে যেন নতুন এক নিশ্চিন্ত আলো জ্বলে উঠেছে।

চলবে…

সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ৩২: অনিশ্চিত পথের শুরু

রবিবার সকাল।
আকাশটা যেন কেমন ধূসর। হালকা কুয়াশার মতো ছায়া পড়েছে গলিপথে। অভির মনে হচ্ছে—আজকের দিনটা অন্যরকম।

গতরাতে ঐশীর বুকে মাথা রেখে সব খুলে বলার পর অনেকটা হালকা লাগছে। কিন্তু তবুও মনে একটা চাপা কাঁপুনি আছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে আবার ভেসে উঠল সেই মেসেজ—
“অভি, কাল দুপুরে কফি হাউসে দেখা করো। প্লিজ।”

অভি কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।

মা অভির দিকে তাকিয়ে বললেন —
“অভি, আজ রবিবার। সকাল সকাল চা খেয়ে নে, তারপর তোর কাজ নিয়ে ভাবিস।”

অভি চুপচাপ মাথা নাড়ল।

দুপুর নাগাদ ঐশী এল। হাতে কয়েকটা বই।
“এগুলো কাল লাইব্রেরী থেকে এনেছি, তোমার কাজে লাগবে ভাবলাম।”

অভি তার হাত থেকে বইগুলো নিয়ে টেবিলে রাখলো। তারপর একটু দ্বিধা করে বলল—
“ঐশী, আজ হয়তো আমাকে কফি হাউসে যেতে হবে।”

ঐশী শান্ত মুখে অভির দিকে তাকালো।
“হ্যাঁ, যাও। তবে মনে রেখো—তুমি যেখানেই যাও না কেন, তোমার ঘর এখানে, আমার কাছে।”

অভি মৃদু হাসল।
ঐশীর এই নির্ভরতা তাকে নতুন সাহস দিলো।

অভি দুপুরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুটি প্রকাশনীর মালিকের বাড়িতে গিয়ে তাদের সাথে কিছু হালকা কথাবার্তা সেরে কফি হাউস যাবে ঠিক করলো। সেই মতো বেরিয়ে গেলো।

ঐশী সেখানে সন্ধ্যে পর্যন্ত কাটিয়ে অভির সাহিত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এগিয়ে রেখে বাড়ি ফিরবে ঠিক করলো।

এদিকে রবিবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল - কফি হাউস।
সন্ধের আলো নেমে আসছে। বাইরে ব্যস্ততা, ভেতরে গ্লাসের টুংটাং শব্দ, টেবিল জুড়ে চেনা অচেনা মুখ।

অভি ঢুকতেই দেখতে পেল—এক কোণে বসে আছে সৃজিতা।
মাথার উপরে কালো ফ্রেমের সানগ্লাস, খোলা পরিপাটি চুল কাঁধ পর্যন্ত, পরনে বেশ রঙিন শাড়ি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক।
কিন্তু চাহনিতে সেই পুরোনো অস্থিরতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত চাপা টান।

অভি ধীরে গিয়ে চেয়ারে বসল। সৃজিতার ঠোঁটে সাজানো একরকম কৃত্রিম হাসি। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ। সৃজিতা নিঃশব্দে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

সৃজিতা শুরু করলো - "সেই দুপুর থেকে বসে আছি। বেশ বুঝতে পারছি টানটা আর আগের মতো নেই। অবশ্য তুমি তো এখন সেলিব্রিটি। প্রেমের সেই দিনগুলোতে তুমি যেমন আমার জন্য অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করতে, আজ মনে হলো তার প্রতিশোধ নিলে, আমিও অনুভব করলাম, তোমাকে অতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য তোমার কিরকম লাগতো। আমি সত্যিই দুঃখিত সেই দিনগুলোর জন্য।"

অভি - "ঠিক সেটা নাহ্, আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে আসতে একটু দেরি হয়ে গেলো।"

সৃজিতা - "স্বাভাবিক আমি এখন তোমার কাছে গুরুত্বহীনই বটে।"

ইতিমধ্যে ওয়েটার এলো অর্ডার নিতে। সৃজিতা অভির দিকে তাকিয়ে - "তুমি কি সেই পুরনো রোবাস্টা, নাকি সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়েছে?"

অভি - "একই, আমি সময়ের সাথে নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারিনি।"

কথাটা সৃজিতার মনে খুব বিধলো, কিন্তু কিছু বললো না।

সৃজিতা (ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে) - "একটা ক্যাপুচিনো রোবাস্টা আর একটা কোল্ড কফি।" 

সৃজিতা অবশেষে বলল—
“অভি, তুমি একদম বদলে গেছো। আগে তোমাকে এভাবে দেখিনি। তোমার চোখে এখন আত্মবিশ্বাস, তোমার মুখে সেই হারানো দীপ্তি ফিরে এসেছে। এখন সবাই তোমার নাম করছে। জানো, আমি… আমি গর্বিত যে তোমাকে কোনোদিন আমার বলতে পেরেছিলাম।”

অবশেষে কফি এসে গেল।

অভি কফিতে এক চুমুক দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল—
“ধন্যবাদ। কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ এই ডাক কেন?”

সৃজিতা একটু কেঁপে উঠল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
“আমি ভুল করেছি অভি। আমি ভেবেছিলাম টাকাপয়সা, আড়ম্বরেই সুখ লুকিয়ে আছে। কিন্তু বুঝতে পারিনি… তোমাকে হারিয়ে আমি আসলে নিজেকেই শূন্য করে ফেলেছি।”

অভি চোখ নামিয়ে কফির কাপে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
“যখন কিছুই ছিল না আমার, তখন তুমি আমার পাশে থাকতে পারলে না। আজ আমি যখন একটু উঠে দাঁড়িয়েছি, তখন তুমি আবার ফিরে আসতে চাইছো। এটা কি ন্যায়সঙ্গত?”

সৃজিতার চোখ ভিজে এল।
“আমি জানি, তোমাকে আর পাবো না। তবুও এই একবার বলতে চেয়েছিলাম—আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”

অভি শান্ত গলায় উত্তর দিল—
“সৃজিতা, তুমি তোমার সংসার যেরকম চেয়েছিলে সেরকম পেয়েছো, এমনকি সবকিছু উপভোগ করেছো। এখন সব সুযোগ সুবিধা হাতের কাছে পাচ্ছো। তোমার কিসের অভাব আজ? তোমার স্বামী, তোমার মেয়ে—ওরাই তোমার সত্যি। আমি এখন তোমার অতীত। আমার কাছে আজ অন্য এক আলো এসেছে, যার নাম ঐশী। আর তুমি আমায় ছুঁড়ে ফেলে না দিলে, আজও হয়তো তোমারই থাকতাম। আমাকে ছেড়ে যাকে বিয়ে করেছিলে তার সাথেও তো অনেকটা সময় তুমি চুটিয়ে প্রেম করেছো, তারপর বিয়ে করেছো। তখন কি একবারও আমার কথা মনে পড়েছিলো? কি করছি, কিভাবে দিন কাটাচ্ছি! এটা তো মিথ্যা নয়।”

সৃজিতা নীরব হয়ে রইল।
চারপাশের কোলাহলের মাঝেও যেন এক নিস্তব্ধতা ভেসে উঠল। তারপর সেই কথা খুব চালাকির সাথে এড়িয়ে বললো
“মনে আছে অভি, সেদিন তোমার কাছে ক্লাস করতে গিয়েছিলাম, তুমি বলেছিলে—‘তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি।’ তখন আমি উচ্চমাধ্যমিকের দোরগোড়ায়। আমি এখনও তোমার চোখে তাকালে সেই কথাগুলো শুনতে পাই। বলো, সত্যিই কি একেবারেই কিছু বাকি নেই তোমার ভেতরে?”

অভি এবার চোখ তুলে তাকাল। ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে।
“তুমি এখন কেন এসব বলছো? যখন আমার জীবনটা ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছিল, তোমার ভালোবাসা হারিয়ে আমি তখন অথৈ জলে, জীবনের চারিদিক অন্ধকার, আমি তখন দিশেহারা, কোনদিকে গেলে সঠিক পথ পাবো ভেবে পাচ্ছিনা; তখন তো তুমি চলে গেলে দিব্যেন্দু দা'র গাড়ি-বাড়ি, টাকার কাছে। তখন তো তোমার এসব ভালোবাসা মনে পড়েনি। যখন আমার কিছুই ছিল না, তখন তো তোমার চোখে আমার কোনো মূল্য ছিল না।”

সৃজিতা একটু থেমে গলাটা নরম করল এবং পুরানো প্রেমের স্মৃতিকে আরও একটু উস্কে দেওয়ার চেষ্টায় মগ্ন হলো।
“অভি, তুমি কি ভুলে গেছো সেই দিনগুলো? যখন মাধ্যমিক পাশ করে সদ্য ইলেভেনে উঠলাম, তখন আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে গিয়ে বলেছিলাম, "স্যার আমি আপনার জন্যই এত ভালো রেজাল্ট করেছি, মানছি আমি আপনার থেকে অনেক ছোট, তবুও এখন কি আমি আপনার মন পাওয়ার যোগ্য হতে পেরেছি?" কিছুক্ষণ থেমে সৃজিতা কফিতে একটু চুমুক দিয়ে আবার বলতে শুরু করলো - "তখন কিন্তু তুমিই হাঁটু গেড়ে বসে প্রথম আমাকে একটা লাল গোলাপ আর ক্যাটবেরি দিয়েছিলে, আর হাত ধরে বলেছিলে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি! মনে পড়ে সে কথা?" তখন যদি তুমি না বলতে, আমি কিন্তু আর এগোতাম না; আবার বৃষ্টির দিনে একদিন তুমি বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলে, সদ্য কলেজে ওঠা আমি তখন কলেজ থেকে ভিজতে ভিজতে ফিরছিলাম, তুমি এগিয়ে এসে ছাতাটা ধরে আমাকে ভিজতে দাওনি! আমি কি ভুলতে পেরেছি সেসব?”

অভি চুপচাপ। চোখ নামিয়ে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে আছে। স্মৃতির ধাক্কা তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন ধরালেও মুখ শক্ত রেখেছে।

সৃজিতা কিছুটা অস্থির হয়ে উঠে বলল—
“আমি ভুল করেছি, অভি। আমি ভেবেছিলাম টাকা, ঐশ্বর্য, নিরাপত্তাতেই সুখ লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই সংসারে আমি শুধু শূন্যতা পেয়েছি। দিব্যেন্দু দিন রাত ব্যস্ত থাকে, মেয়েটাকে বড় করছি একাই। অথচ তুমি… তুমি আজ আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করলে—মানুষ নিজের শক্তিতে কেমন করে উচ্চতায় উঠতে পারে। আর আমি? আমি শুধু তোমাকে হারিয়ে নিজের সর্বনাশ করেছি।”

একটু থেমে, কণ্ঠ ভিজিয়ে আবার বলল—
“অভি, আমি জানি আমি তোমাকে আর পাবো না। তবুও… আজ আমি আবার বলতে চাই, আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। যদি একটুও তোমার মনে আমার পুরোনো অভির অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে তুমি সেটা অনুভব করবে।”

অভির বুকের ভেতর যেন পুরোনো প্রেমের হাওয়া এক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সৃজিতার সেই কাঁচা বয়সের দিনগুলো — মনে পড়ছে ক্লাস এইট থেকে তার কাছে পড়তে আসা এক ছাত্রী কিভাবে তার প্রেমিকা হয়ে উঠলো, মনে পড়ে গেলো ক্লাস টেনে ওঠার পরই সৃজিতার তাকে প্রথম প্রেমপত্র দেওয়ার কথা। বয়সে অনেক ছোট বলে সেদিন খুব ধমক দিয়েছিলো সৃজিতাকে। সেদিন, ও খুব কেঁদেছিলো। তারপর ধীরে ধীরে কবে যে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসা, মনে পড়ে না আর। ক্লাস টুয়েলভে পড়ার সময় গঙ্গার ধারে হাঁটতে হাঁটতে স্বপ্ন বলা, বৃষ্টির ভেজা বিকেল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে আবার টেনে নিতে চাইছে তাকে পুরোনো ঘূর্ণিতে।

কিন্তু অভি গভীর শ্বাস নিয়ে গলাটা শক্ত করল।
“না সৃজিতা। তুমি ভুল করছো। আজ আমি অন্য মানুষ। হ্যাঁ, অতীত ভুলিনি, কিন্তু আজকের আমি সেই অতীতের অভির কাছে ফিরে যেতে পারি না। আমার আজকের জীবনে ঐশী আছে—সে আমাকে যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে আগলে রেখেছে, তুমি সেটা কখনও করোনি।”

সৃজিতা কাঁপা গলায় বলল—
“তাহলে তুমি সত্যিই আর একটুও আমায় অনুভব করো না? তুমি কি একদমই ভুলে গেলে আমাকে?”

অভি শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল—
“ভুলিনি। কিন্তু সেই স্মৃতি এখন শুধুই অতীত। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আছে ঐশীর হাত ধরে। তোমার কাছে আছে তোমার সাজানো সংসার - দিব্যেন্দু দা, তোমার মেয়ে, তোমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি - আভিজাত্যে ভরপুর। সমাজে দিব্যেন্দু দা'র স্ত্রী হিসাবে তোমার একটা বিশাল সন্মান আছে। দয়া করে তোমার নিজের পৃথিবীটা ভেঙো না।”

সৃজিতার চোখে জল এসে গেল। ঠোঁট কাঁপছে।
সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু অভি আর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। সৃজিতা বুঝলো অভিকে আর তাদের পুরানো প্রেমের কথা বলে গলানো সম্ভব না।

অভির চোখের গভীরে অদ্ভুত এক অভিমান, কিন্তু গলায় দৃঢ়তা—
“বিদায় রুমা।”

অভি বেরিয়ে গেল কফি হাউস থেকে। বাইরে হাওয়ায় ভেসে আসছিল ভিড়ের শব্দ, গাড়ির হর্ন। কিন্তু তার ভেতরে যেন এক নতুন শান্তি।

অন্যদিকে, সৃজিতা চুপচাপ টেবিলে বসে রইল, চোখের সামনে ধোঁয়া ওঠা অভির কফির কাপ—সৃজিতা চুপচাপ কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। যেন তার নিজের শূন্য জীবনের প্রতিচ্ছবি।

চলবে…

পর্ব ৩১: অতীতের ছায়া

শনিবার সকাল।
অভি একটু দেরি করে, সকাল ৯টার পর ঘুম থেকে উঠল। জানলার পাশে বসে রাতের অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সেই বার্তাটা যেন বারবার চোখে পড়ছে—

“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

এক অজানা টান আর দ্বিধার মাঝে পড়ে অভি।
অন্যদিকে, তার ভেতরের নতুন আশ্রয়—ঐশী—গতরাতে কেমন করে বুক ভরে তাকে আগলে রাখল, সেই স্মৃতি তাকে শক্তিও দিচ্ছে, আবার দ্বন্দ্বও বাড়াচ্ছে।

এমন সময় পাশের ঘর থেকে মায়ের ডাক -
“অভি, উঠেছিস?”

অভি ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে - 
"বলো মা"

মা - "জলখাবার আর চা রেখেছি টেবিলে, দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে খেয়ে নে।"

অভি - "ঠিকাছে মা। একটু বাথরুম হয়ে আসি, চা'টা আরেকবার গরম করে দিও প্লীজ মা।"

মা - "আচ্ছা বাবা।"

কিছুক্ষণ পর অভি ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো। জলখাবার খেতে খেতে মা চা গরম করে এনে দিলো।
তারপর হেসে বললেন - "আজ তো শনিবার, তোর ভাইয়ের আজ হাফ, তাই বিকেল বিকেল আসবে আর বলেছে চপ, সিঙ্গারা নিয়ে আসবে; বলে গেছে, দাদাকে বলে রেখো বৌদিকে বলে রাখতে, সে যেনো বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসে।"

অভি বললো - "এখন কিভাবে বলবো? সে তো এখন কলেজে ক্লাস করছে, ওর বৌদিকে ও তো গতকাল নিজেই বলতে পারতো, ঠিক আছে দাঁড়াও আমি একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।"

খাওয়ার খেয়ে অভি স্নান সেরে একটা কাজে বেরোলো আর মাকে বলে গেলো যে সে এসে লাঞ্চ করবে।

দুটো নাগাদ অভি এসে দুপুরের প্রাতঃরাশ সেরে ঘরে গিয়ে নিজের সাহিত্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ দরজায় শব্দ হল।
হাতে একটা কাগজের প্যাকেট নিয়ে ঢুকল অরিজ। অফিস থেকে ফেরার পথে গরম গরম সিঙাড়া-চপ নিয়ে এসেছে।

অরিজ (হাসতে হাসতে):
“দাদা, তুই তো রাতজাগা কবি। আজকাল তোদের ঘরে গিয়ে ঢুকলেই দেখি হাওয়ার মতো এক খুশির গন্ধ। কে জানে কিসের গন্ধ!”

অভি (হালকা মুচকি হেসে):
“তোর এসব ফাজলামো কম হয় না রে।”

ঠিক তখনই ঐশী এল। কলেজ আর টিউশন করে একবারে ফিরেছে, আজ তারও হাফ ডে ছিলো। এমনিতেই ঐশী বেশ সুন্দরী। কিন্তু ক্লান্ত শরীরেও ঐশীকে বেশ উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিলো যেন প্রেম তার জীবনকে আরও তরতাজা করে দিয়েছে। আর হবু শ্বশুরবাড়ির সবাই তাকে ভীষণ আপন করে নিয়েছে। যদিও নিজের বাড়িতে তার বাবা একটু চিন্তান্বিত।

অরিজ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে প্যাকেট বাড়িয়ে দিল—
“এই যে বৌদি! তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছো। গরম গরম সিঙ্গাড়া আর চপ নিয়ে এসেছি সবার জন্য। চপ সিঙ্গারা আর তোমার হাতের দারুণ চা এই বিকেলের আসর জমিয়ে দেবে।”

মৈত্রেয়ী দেবী - "আরে দাঁড়া ওকে একটু জিরিয়ে নিতে দে, দেখছিস তো মেয়েটা কলেজ থেকে সদ্য ক্লান্ত হয়ে এসেছে।"

ঐশী (হেসে): "না কাকিমা আমি ঠিক আছি। আর ভবিষ্যতে এরকম প্রাণবন্ত একটা শ্বশুরবাড়ির বউ হতে পারবো এই মধুর অনুভূতিই আমার সব ক্লান্তি দুর করে দেয়, তাই তো কলেজ ছুটির পর বাড়ি না গিয়ে আমি এখানে ছুটে আসি।"
অরিজের দিকে তাকিয়ে - "আমাকে দাও প্যাকেটটা, আমি ওটা পরিবেশন করে দি, তোমরা খাও, আমি চা বানিয়ে আনছি।"

অরিজ (চোখ টিপে):
“ওটা তো হবু বৌদির হাতে প্রথম সিঙাড়া খাওয়ার সৌভাগ্য আমার হবে, তাই না?”

ঐশী স্নেহের চোখে অরিজের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে রান্নাঘরে চলে গেলো।

অল্প পরেই চা এল। অরিজ প্রথম চুমুক দিতেই বলে উঠল—
“উফ বৌদি, তোমার চা তো আসলেই দারুণ!”

মা মৃদু হেসে বললেন—
“তুই কিন্তু বৌদির হাতে চা খাওয়ার নেশায় পড়ে যাবি।”

ঘরটা কিছুক্ষণ আগেও নিস্তব্ধতার ভারে আচ্ছন্ন ছিল। এখন যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠল হাসি-ঠাট্টায়।

সবাই যখন মজা করছে, হাসছে, তখন অভির ভেতরটা যেন বারবার কেঁপে উঠছে। সে জানে, অতীতের সঙ্গে এই দেখা—তার বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিতে পারে।

ঐশী তখন চুপচাপ অভির দিকে তাকাল। অভি চোখ নামিয়ে নিল। তার মনে তখনও ঘুরছে সেই বার্তা—
রুমার ডাক।

ঐশী একটু পরে পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল—
“কি হয়েছে অভি? তোমার মুখটা এত গম্ভীর কেন?”

অভি শুধু হালকা হাসল।
কিন্তু চোখের গভীরে সেই অস্থিরতা লুকিয়ে রাখা গেল না।

কিছুক্ষণ আড্ডার পর মা, বাবা আর অরিজ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
ঘরে রইল কেবল অভি আর ঐশী।

ঐশী ধীরে বলল—
“অভি, তুমি সত্যিই কিছু লুকাচ্ছো না তো আমার থেকে?”

অভি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল আর চুপ করে ঐশীর চোখের দিকে তাকাল। মনে হল, ঝড়ের ভেতরেও ঐশীর উপস্থিতিই তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

অভি একটু সাহস করে বললো “ঐশী… তোমাকে আগেও বলেছি, কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো থেকে আমি পালাতে চাই। কিন্তু সেগুলো আমাকেই তাড়া করে ফিরছে।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে -
"জানো, গতকাল আমার প্রথম প্রেম সৃজিতা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছে দেখা করার জন্য। আগেও এড়িয়ে গেছি, আর এখন তো তুমি আমার জীবনের আলো। আমি তাই ভাবছি ইগনোর করবো নাকি গিয়ে শুনবো কি বলতে চায়। আমি তো তাকে ছেড়েছিলাম নাহ্, সে নিজেই কোনও কারণ ছাড়া আমার বিশ্বাস, ভরসা আর প্রেম একসময় ছুঁড়ে ফেলে অন্য একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিলো। তাহলে সে এখন আবার কি চায়?"

ঐশী তার হাত ধরে দৃঢ় স্বরে বলল -
"তুমি গিয়ে দেখো সে কি বলতে চায়। এর জন্য আমি তোমাকে কখনও ছেড়ে যাবো না। তুমি নিশ্চিন্তে যাও অভি।"

ঐশী কাছে এসে দুই হাত দিয়ে অভিকে বুকে জড়িয়ে ধরলো আর মাথায় হাত দিয়ে আদর করতে করতে চোখ বুজে শারীরিকভাবে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো এবং আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো - "আমি তোমারই থাকবো কথা দিচ্ছি বেবী।"

অভি ঐশীকে তার অতীতের ছায়ার সবকিছু বলার পর যেনো মনে থেকে পুরোপুরি হালকা হয়ে গেলো। দুজনেই দুজনের কাছে এখন স্বচ্ছ। আর কোনও লুকানোর কিছু রইলো না।

চলবে…

পর্ব ৩০: নতুন আলাপন

রাত আটটা বেজে গেছে, দুজনে এখনও খুব কাছাকাছি। কিন্তু দুজনেই সেই ম্যাসেজটা নিয়ে দোলাচলে, কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না।

সম্বিৎ ফিরলো দরজার টোকায় - "আসবো"

ঐশী চমকে অভির থেকে কিছুটা সরে গেলো, অভি দরজায় তাকিয়ে দেখলো ভাই।
অভি - "বাবা, তুই আবার কবে এতো ভদ্র হলি রে, দরজায় টোকা মেরে পারমিশন নিচ্ছিস, তাও নিজের দাদার ঘরে!!

ঘরে ঢুকলো এক লম্বা চেহারার, হাসিখুশি যুবক অরিজ।
অরিজ (ঐশীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে মুচকি হেসে) - "তা তো নিতেই হবে। এখন থেকেই তার প্র্যাকটিস করছি!!"

অভি - "বাচালতা ছেড়ে কি বলতে এসেছিস বল!!"

অরিজ - "আমি তোর সাথে দেখা করতে আসিনি রে দাদা, আমি আমার হবু বৌদির সাথে আলাপ করতে এসেছি।" তারপর অভির দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে - "তুই তো আর আলাপ করালি নাহ্!! মায়ের কাছ থেকে শুনে আলাপ করতে এলাম!"
এবার ঐশীর দিকে তাকিয়ে - “এই যে বৌদি প্রার্থী! মায়ের কাছে শুনলাম দেবীর মতো রান্নাঘরে রাজত্ব করছেন। সবাইকে চা বানিয়ে খাইয়েছেন, তো আমি কি চা পাবো না?”

ঘরটা কিছুক্ষণ আগেও একটা দমবন্ধকর আশঙ্কায় ভরে উঠছিলো, অরিজ আসার পরে বাড়িটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

ঐশী (মুচকি হেসে) - "নিশ্চয়ই আমার হবু দেবর, এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি। কাকিমা বলছিলেন, তোমার বউদি হয়ে যাবো—তাহলে চা না খাইয়ে কি ছাড়া যায়? তবে আমি কিন্তু তোমার থেকে অনেক ছোট - তোমার মা বলেছেন। তাই তুমি আমাকে আপনি আজ্ঞে না করে তুমি ডাকলেই আমি খুশি হবো আর নাম ধরেই ডেকো।"

তক্ষুনি মায়ের প্রবেশ। মৈত্রেয়ী দেবী কিছুটা বকুনির ভঙ্গিতে
"না মা, বড়ো হলে কি হবে, সম্পর্কে তো ছোটই হবে। আর ওর দাদা ওর থেকে অনেক বড়ো, তাই তার হবু স্ত্রীকে তার ভাই বৌদি বলেই ডাকবে। এর যেনো অন্যথা না হয়। ওর বাবা এবং আমি দুজনেই এতো আধুনিকতা চাই না।"

অরিজ খিলখিল করে হেসে উঠল—
“দেখো মা, আমি কিন্তু এসে থেকেই আমার হবু বৌদিকে বৌদি ডাকছি। কে জানে, পরেরবার আসতে দেরি করলে আবার বদলে যাবে নাকি!”

মৈত্রেয়ী দেবী পাশে দাঁড়িয়ে বললেন—
“তোর এই ফাজলামো যাবে না অরিজ। তুই শুধু মুখে মুখে খেলাস, আসল সময়ে ঐশীর মতো কেউ যদি পাশে না থাকে, তোরা মানুষ হবি কেমন করে?”

অরিজ মাকে হেসে জড়িয়ে ধরল—
“মা, তুমি তো জানো, আমি কেবল হাসি-ঠাট্টা করতে ভালোবাসি। কিন্তু দাদার জন্য এমন বৌদি যদি পাই, তাহলে তো আমার জীবনও জমে যাবে!”

ঘরভর্তি হাসির রোল উঠল।
অভি দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মনে মনে খুশি হল। অনেকদিন পরে তার ঘরে এমন আনন্দময় পরিবেশ।

ঐশী (লাজুক হেসে) - "দাঁড়াও অরিজ, আমি তোমার জন্য এক্ষুনি চা বানিয়ে আনছি।"

অরিজ - "বৌদি, আমি কিন্তু দাদার মতো নিরামিষ চা খাই না! দুধ, চিনি দিয়ে করে দেবে।"

ঐশী ঠিক আছে বলে রান্না ঘরে চলে গেলো।

কিছুক্ষণ পর ঐশী চা এনে অরিজকে দিলো।

অরিজ (চায়ে চুমুক দিয়ে) - "উফ বৌদি কি চা বানিয়েছো।"

ঐশী (একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে) - "কেনো ভালো হয়নি?"

অরিজ - "মা, আমাদের বাড়ির একজন চা স্পেশালিস্ট এসে গেছে। এবার থেকে প্রতিদিন বৌদি সন্ধ্যাবেলায় আমায় চা খাওয়াবে।"

মা - "হ্যাঁ, ওটাই বাকি আছে। তোর বৌদির আর কলেজ নেই, পড়া নেই, আর অন্য কোনও কাজ নেই, তোর জন্য সন্ধ্যাবেলায় এসে নাকি বাড়িতে চা বানিয়ে খাওয়াবে! শখ কতো!"

অরিজ - "সেটা তো দাদার উপর ডিপেন্ড করছে। কবে দাদা পাকাপাকি ভাবে হবু বৌদিকে আমার নিজের বৌদি করবে।"

কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে আড্ডায় বসল। ছোটখাটো খুনসুটি, গল্প, স্মৃতিচারণা—মনে হচ্ছিল সংসারে আবার আলো ফিরে এসেছে।

কিন্তু রাত বাড়তে থাকল। একে একে সবাই ঘর ছেড়ে গেল। অরিজ চলে গেল নিজের ঘরে, অভির বাবা টিভি দেখতে বসলেন, মা রান্নাঘরে কাজ শেষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ঘরে রইল শুধু অভি আর ঐশী।
টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলটা তখনও স্ক্রিনে আলো ছড়াচ্ছে। ঐশীর দৃষ্টি বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছিল।

অভি চুপচাপ মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।
সেই মেসেজটা এখনও অক্ষত—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

অভির চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
ঐশী অভির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
“অভি, কিছু লুকাচ্ছো না তো আমার থেকে?”

অভি গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
“ঐশী… কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো থেকে আমি পালাতে চাই। কিন্তু সেগুলো আমাকেই তাড়া করে ফিরছে।”

অভির চোখে ভেসে উঠল দ্বন্দ্ব, মনের ভেতর ঢেউ।
ঐশী চেয়েছিল আজকের সন্ধ্যেটা হোক শুধু দুজনার—
কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের সেই বার্তা তাদের নিঃশব্দ ভালোবাসার মাঝেই এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিল।

ঐশী ধীরে তার হাত ধরে বলল—
“তুমি যদি পালাও, আমি তোমাকে আবার টেনে আনব। তুমি একা নও অভি, আমি আছি। আর আমার থেকে তোমাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না”

ঐশী অভিকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। দুজনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরলো।
ঐশী (মৃদু কন্ঠে) - "এই আমি তোমাকে আমার বুকে আঁকড়ে ধরলাম। দেখি কে আমার থেকে আমার অভিকে ছিনিয়ে নেয়।"

রাত প্রায় নটা -
অভি (আবেগ কন্ঠে) - "রাত হচ্ছে, তোমাকে তো ফিরতে হবে।"

ঐশী (খুব হালকা স্বরে) - "হ্যাঁ গো, কাল আবার কলেজ আছে। আমি চাই তুমি আমাকে খুব শিগগির এই বাড়িতে নিয়ে আসো। যাতে তোমাকে ছেড়ে আর যেতে না হয়। আমার তোমাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না।"

অভি (মৃদু কন্ঠে) - "আমিও তাই চাই। আমিও তোমাকে আর ছেড়ে থাকতে পারছি না।"

দুজনে আলিঙ্গনমুক্ত হলো। ঐশী বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে বাড়ির সবাইকে বলে বেরিয়ে গেলো।

এদিকে অভি সৃজিতার সেই ম্যাসেজটা নিয়ে চিন্তামগ্ন হয় পড়লো।

চলবে…

পর্ব ২৯: প্রেমের টান

রাত যত গাঢ় হয়, সৃজিতার অস্থিরতা ততই বাড়তে থাকে।
ঘরে শুয়ে থাকা মেয়েটার ঘুমন্ত মুখ দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।
“ওর জন্যই তো আমি লড়ছি… তবুও কেন মনে হচ্ছে আমার ভেতরে এত শূন্যতা?”

মোবাইল হাতে নিয়ে আবারও খুলল সেই খবর—অভিনব আর পাশের মেয়েটির ছবিটা।
মেয়েটির হাসি, ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত আর অভির আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি—সবকিছু যেন সৃজিতাকে তাড়া করছে।

হঠাৎ করেই বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
“যখন অভির কিছুই ছিল না, তখন আমি তাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম।
আজ যখন অভি আলোয় ভরে উঠেছে, তখন কেন আমি আবার তার দিকে টান অনুভব করছি? এটা কি ন্যায়সঙ্গত?”

পরেরদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে—
অভিনব তখন নিজের ঘরে খাতা খুলে বসে আছে। আর ঐশী অভির বাড়িতে....

অভির মা ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যে দিতে গেছেন। বাবা বারান্দায় বসে রাস্তা দেখছেন।
ঐশী নিজের উদ্যোগে নিজের বাড়ি মনে করে সবার জন্য চা বানাচ্ছে রান্নাঘরে।

কিছুক্ষণ পর মৈত্রেয়ী দেবী ঠাকুর ঘর থেকে ডাইনিং রুমে এসে দেখলেন ঐশী সবার জন্য চা বানিয়ে টেবিলে রাখছে।
বললেন - "একি মা, তুমি আবার এসব করতে গেছো কেনো? আমি তো সন্ধ্যা দিয়ে এসে তোমাদের জন্য চা করতাম!!"

ঐশী - "তাতে কি হয়েছে কাকিমা, আমি তো এখন নিজেকে এই বাড়িরই একজন মনে করি। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমাকে এখন হয়তো বাড়ি চলে যেতে হয়, কিন্তু আপনাদের বিশ্বাস, ভরসা আর আশীর্বাদ থাকলে আমি তো ভবিষ্যতে আপনাদেরই একজন হবো।"

অভির মা (আবেগতাড়িত হয়ে) - "আচ্ছা ঠিক আছে মা, তুমি যেটা ভালো মনে করো, কোরো নিজের মনে করে, আমি আর কিছু বলবো না।"
কিছুক্ষণ থেমে - "আচ্ছা মা, তোমার সাথে তো বাড়ির আরেকজনের আলাপ হওয়া বাকি।"

ঐশী - "কে কাকিমা?"

মা - "আমার ছোট ছেলে, তোমার অভির ছোট ভাই অরিজের সাথে।"

ঐশী - "হ্যাঁ কাকিমা, গতকাল সকালে আমি বাড়িতে ঢোকার সময় দেখেছি ওকে!"

মা - "হ্যাঁ, ও আসবে সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ। তুমি ততক্ষণ থাকলে দেখা হয়ে যাবে। তবে আমরা তোমার ব্যাপারে ওকে কিছু জানাইনি। আসলে বলবো।" তারপর মৃদু হেসে - "ভেবেছি সামনাসামনি ওর হবু বৌদির সাথে আলাপ করিয়ে দেবো।"

ঐশী (লাজুক হেসে) মাথা ঝুঁকিয়ে সবার জন্য চা পরিবেশন করতে করতে বললো - "ঠিক আছে।"

মা - "তুমি তো এখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার, তাহলে তোমার বয়স বছর কুড়ি বা একুশ হবে! কি তাইতো?"

ঐশী - "হ্যাঁ, কাকিমা।"

মা - তাহলে তোমার হবু দেওর তোমার থেকে প্রায় ন'বছরের বড়ো। ও ওই চাকরিটাই যা ঠিকঠাক করে, এছাড়া বাচ্চা বাচ্চা ভাবটা রয়েই গেছে, তোমাদের মতো পরিপক্কতার খুব অভাব। আর ভীষণ ফক্কর।" কিছুক্ষণ থেমে - "আমার ছেলে বলে বলছি না,  এমনিতে আমার ছোট ছেলে খুব ভালো, লোকের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, সবাই ওকে ভালোবাসে, মনে কোনও রকম কোনো প্যাঁচ নেই। মনে যেটা আসে বলে দেয়, কিন্তু যাকে বলছে, সে কিছু ভাবতে পারে ওর কথায়, সেসব মাথায় থাকেনা।"

ঐশী - "কাকিকা আমি কাকুকে গিয়ে চা দিয়ে আসছি।"

মা (একটু খুশি মনে) - "ঠিক আছে মা।"

ঐশী চা নিয়ে অভির বাবাকে বারান্দায় গিয়ে দিয়ে বললো - "কাকু চা। আমি বানিয়েছি, খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে?"

অভির বাবা চা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে ঐশীর দিকে তাকিয়ে বললেন - "তুমি কি বাড়িতেও চা বানাও?"

ঐশী - "বাড়িতে থাকলে আমিই বানাই।" কিছুক্ষণ চুপ করে, "এটা কেমন হয়েছে কাকু?"

অভির বাবা - "বেশ ভালো।"

ঐশী (নিশ্চিন্তের মৃদু হাসিতে) - "ধন্যবাদ কাকু" বলে ডাইনিং রুমে ফিরে এসে মৈত্রেয়ী দেবী (অভির মা)-কে চা বাড়িয়ে দিলো।

মৈত্রেয়ী দেবী চা নিয়ে ইন্দ্রনাথ বাবুর কাছে যাওয়ার সময় ঐশীকে বললেন - "যাও মা, অভির চা-টা নিয়ে অভির কাছে যাও, আমি তোমার কাকুর কাছে যাচ্ছি।"

অভির ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু বন্ধ করে চুপচাপ চেয়ার টেনে তার পাশে বসল।

“অভি…”
অভি মাথা তুলল।
“চা নাও।" কিছুক্ষণ থেমে "তুমি জানো, তোমার জীবনে আমার কত বড় ভূমিকা সেটা আমি কাউকে দেখাতে চাই না। শুধু চাই, তুমি যেন আর একা না থাকো।”

অভির ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল, চায়ে এক চুমুক দিয়ে - বাহ্ চা তো দারুণ করো তুমি!"

ঐশী খুশি হয়ে একটু নাটকীয়ভাবে - "থ্যাঙ্ক ইউ ডার্লিং।"

দুজনে চা খাওয়া সম্পূর্ণ করে, একটু সাহিত্য নিয়ে আলাপচারিতা করলো।

তারপর অভি -
“ঐশী, তুমিই তো আজ মানসিকভাবে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়েছো। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।”

ঐশীর চোখে তখন এক নিবিড় আলো।
সে জানে—এই মুহূর্তে অভি তাকে নিজের ভেতর ঢুকতে দিয়েছে। দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে - তারা যেনো দুজনেই কোন এক অজানা কাল্পনিক প্রেমালাপে ডুব দিয়েছে।

সন্ধ্যা নেমেছে - দুজনে আরও কাছাকাছি। অভি নিজের চেয়ারে বসে টেবিলে নিজের লেখা দেখছে। ঐশী এসে পাশে দাঁড়িয়ে অভির লেখা দেখে মুগ্ধ চোখে লেখা দেখছে আর অভির দিকে তাকাচ্ছে।

অভি - "ঐশী তোমাকে আর ছেড়ে থাকতে পারছি না"

ঐশী আরও কাছে এসে দাঁড়িয়ে অভিকে নিজের বুকে টেনে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো। মাথা নিচু করে অভির দিকে তাকিয়ে, অভির চুলে নিজের কোমল আঙুল বোলাতে বোলাতে বললো - "আমিও না গো, অভি! তুমি শুধু আমার, তোমার উপর শুধু আমারই অধিকার। আমি তোমাকে এভাবেই আগলে রাখবো, তুমি দেখো অভি।"

কিন্তু ঠিক তখনই—
অভির ফোনে এক অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ ভেসে উঠল।

অভি ঐশীর বহুবন্ধ থেকে মাথা সড়িয়ে দেখলো হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ। রাত প্রায় আটটা। শব্দগুলো ছোট, অথচ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

অভির বুক ধক করে উঠল। ঐশী অভির মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে আন্দাজ করতে পারলো যে অভিনব ম্যাসেজটা দেখে একটু চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছে, কিন্তু ঐশী তেমন কোনও কৌতূহল দেখালো না, তবে জিজ্ঞেস করল - "কিছু কি সমস্যা হয়েছে?"

অভি কথাটা গোপন রেখেই বললো - "তেমন কিছু না।"

তবে ঐশী মনে মনে ভাবল—
“মনেহচ্ছে ভাগ্য সত্যিই আমাদের প্রেমের কিছু পরীক্ষা নিতে চলেছে।”

নিস্তব্ধতায়, দুই ভিন্ন ঠিকানায় দুটো মানুষ—অভি আর সৃজিতা— অস্থিরতার ভেতর হারিয়ে গেল।

চলবে…

পর্ব ২৮: দ্বন্দ্বের আঁচ

অভিনবের জীবনে পরিবর্তন স্পষ্ট।
কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখন শুধু ওর লেখা পড়ে না, ওকে নিয়ে আলোচনা করে, ওর ফ্যানস অনেক। ছোট ছোট অনুষ্ঠান, সাহিত্যসভা—সবখানেই অভির ডাক পড়ছে।

ঐশী নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কখনো প্রুফ দেখে দিচ্ছে, কখনো অনুষ্ঠানের আয়োজন সামলাচ্ছে। তার উপস্থিতিতে অভির ক্লান্তি কমে যায়। একদিন অনুষ্ঠানের পর ঐশী ধীরে বলেছিল—
“অভি, তুমি শুধু লেখক নও, তুমি অনেকের স্বপ্ন। আর আমি চাই, আমি তোমার শক্তি হয়ে থাকি।”

অভি শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিল, মনে মনে ভেবেছিল—
“যখন সব হারিয়েছিলাম, তখন পাশে কেউ ছিল না। আর আজ যখন উঠে দাঁড়াচ্ছি, তখন ঐশী আছে। এর উত্তর আমি কীভাবে দেব?”

অন্যদিকে, সৃজিতা নিজের সংসারে এক অদ্ভুত অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। দিব্যেন্দুর সাফল্য আছে, কিন্তু তার সঙ্গে সম্পর্ক যেন দূরে সরে গেছে। প্রায়শই রাতের খাবার একা খেতে বসতে হয়। শাশুড়ি অসন্তোষ প্রকাশ করেন -
“মেয়েমানুষদের সংসার আঁকড়ে ধরতে হয় রুমা, খামখেয়ালিপনা মানায় না।”

সৃজিতা জানে, বাইরের চোখে সে ভাগ্যবতী নারী। অথচ ভেতরে শূন্যতা যেন প্রতিদিন বাড়ছে। সেই শূন্যতাকেই বাড়িয়ে দিল এক সন্ধ্যায় পড়া খবর—
অভিনবের নতুন বই প্রকাশের অনুষ্ঠান নিয়ে প্রথম সারির দৈনিকের বড় রিপোর্ট। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাসিমুখে অভি, পাশেই দাঁড়িয়ে একটি অত্যন্ত সুন্দরী মেয়ে। মনে হচ্ছে যেন খুব ঘনিষ্ঠ।
শিরোনাম: “সাহিত্যের নবপ্রজন্মের শক্তি—অভিনব গুপ্ত।”

সৃজিতার বুক ধক করে উঠল।
“পাশের মেয়েটি আবার কে?”
অজান্তেই ঈর্ষার আগুন ছড়িয়ে পড়ল ভেতরে।

রাতে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল— “আমি কি ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলাম? না কি আজও অভির জন্য আমার ভেতরে কিছু বেঁচে আছে?”

মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। দিব্যেন্দু তখনও ফেরেনি।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সৃজিতা নিজের ভেতরে চাপা এক সিদ্ধান্তের আঁচ টের পেল।

চলবে…

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...