অভি একটু দেরি করে, সকাল ৯টার পর ঘুম থেকে উঠল। জানলার পাশে বসে রাতের অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সেই বার্তাটা যেন বারবার চোখে পড়ছে—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”
এক অজানা টান আর দ্বিধার মাঝে পড়ে অভি।
অন্যদিকে, তার ভেতরের নতুন আশ্রয়—ঐশী—গতরাতে কেমন করে বুক ভরে তাকে আগলে রাখল, সেই স্মৃতি তাকে শক্তিও দিচ্ছে, আবার দ্বন্দ্বও বাড়াচ্ছে।
এমন সময় পাশের ঘর থেকে মায়ের ডাক -
“অভি, উঠেছিস?”
অভি ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে -
"বলো মা"
মা - "জলখাবার আর চা রেখেছি টেবিলে, দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে খেয়ে নে।"
অভি - "ঠিকাছে মা। একটু বাথরুম হয়ে আসি, চা'টা আরেকবার গরম করে দিও প্লীজ মা।"
মা - "আচ্ছা বাবা।"
কিছুক্ষণ পর অভি ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো। জলখাবার খেতে খেতে মা চা গরম করে এনে দিলো।
তারপর হেসে বললেন - "আজ তো শনিবার, তোর ভাইয়ের আজ হাফ, তাই বিকেল বিকেল আসবে আর বলেছে চপ, সিঙ্গারা নিয়ে আসবে; বলে গেছে, দাদাকে বলে রেখো বৌদিকে বলে রাখতে, সে যেনো বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসে।"
অভি বললো - "এখন কিভাবে বলবো? সে তো এখন কলেজে ক্লাস করছে, ওর বৌদিকে ও তো গতকাল নিজেই বলতে পারতো, ঠিক আছে দাঁড়াও আমি একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি।"
খাওয়ার খেয়ে অভি স্নান সেরে একটা কাজে বেরোলো আর মাকে বলে গেলো যে সে এসে লাঞ্চ করবে।
দুটো নাগাদ অভি এসে দুপুরের প্রাতঃরাশ সেরে ঘরে গিয়ে নিজের সাহিত্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ দরজায় শব্দ হল।
হাতে একটা কাগজের প্যাকেট নিয়ে ঢুকল অরিজ। অফিস থেকে ফেরার পথে গরম গরম সিঙাড়া-চপ নিয়ে এসেছে।
অরিজ (হাসতে হাসতে):
“দাদা, তুই তো রাতজাগা কবি। আজকাল তোদের ঘরে গিয়ে ঢুকলেই দেখি হাওয়ার মতো এক খুশির গন্ধ। কে জানে কিসের গন্ধ!”
অভি (হালকা মুচকি হেসে):
“তোর এসব ফাজলামো কম হয় না রে।”
ঠিক তখনই ঐশী এল। কলেজ আর টিউশন করে একবারে ফিরেছে, আজ তারও হাফ ডে ছিলো। এমনিতেই ঐশী বেশ সুন্দরী। কিন্তু ক্লান্ত শরীরেও ঐশীকে বেশ উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিলো যেন প্রেম তার জীবনকে আরও তরতাজা করে দিয়েছে। আর হবু শ্বশুরবাড়ির সবাই তাকে ভীষণ আপন করে নিয়েছে। যদিও নিজের বাড়িতে তার বাবা একটু চিন্তান্বিত।
অরিজ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে প্যাকেট বাড়িয়ে দিল—
“এই যে বৌদি! তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছো। গরম গরম সিঙ্গাড়া আর চপ নিয়ে এসেছি সবার জন্য। চপ সিঙ্গারা আর তোমার হাতের দারুণ চা এই বিকেলের আসর জমিয়ে দেবে।”
মৈত্রেয়ী দেবী - "আরে দাঁড়া ওকে একটু জিরিয়ে নিতে দে, দেখছিস তো মেয়েটা কলেজ থেকে সদ্য ক্লান্ত হয়ে এসেছে।"
ঐশী (হেসে): "না কাকিমা আমি ঠিক আছি। আর ভবিষ্যতে এরকম প্রাণবন্ত একটা শ্বশুরবাড়ির বউ হতে পারবো এই মধুর অনুভূতিই আমার সব ক্লান্তি দুর করে দেয়, তাই তো কলেজ ছুটির পর বাড়ি না গিয়ে আমি এখানে ছুটে আসি।"
অরিজের দিকে তাকিয়ে - "আমাকে দাও প্যাকেটটা, আমি ওটা পরিবেশন করে দি, তোমরা খাও, আমি চা বানিয়ে আনছি।"
অরিজ (চোখ টিপে):
“ওটা তো হবু বৌদির হাতে প্রথম সিঙাড়া খাওয়ার সৌভাগ্য আমার হবে, তাই না?”
ঐশী স্নেহের চোখে অরিজের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে রান্নাঘরে চলে গেলো।
অল্প পরেই চা এল। অরিজ প্রথম চুমুক দিতেই বলে উঠল—
“উফ বৌদি, তোমার চা তো আসলেই দারুণ!”
মা মৃদু হেসে বললেন—
“তুই কিন্তু বৌদির হাতে চা খাওয়ার নেশায় পড়ে যাবি।”
ঘরটা কিছুক্ষণ আগেও নিস্তব্ধতার ভারে আচ্ছন্ন ছিল। এখন যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠল হাসি-ঠাট্টায়।
সবাই যখন মজা করছে, হাসছে, তখন অভির ভেতরটা যেন বারবার কেঁপে উঠছে। সে জানে, অতীতের সঙ্গে এই দেখা—তার বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিতে পারে।
ঐশী তখন চুপচাপ অভির দিকে তাকাল। অভি চোখ নামিয়ে নিল। তার মনে তখনও ঘুরছে সেই বার্তা—
রুমার ডাক।
ঐশী একটু পরে পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল—
“কি হয়েছে অভি? তোমার মুখটা এত গম্ভীর কেন?”
অভি শুধু হালকা হাসল।
কিন্তু চোখের গভীরে সেই অস্থিরতা লুকিয়ে রাখা গেল না।
কিছুক্ষণ আড্ডার পর মা, বাবা আর অরিজ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
ঘরে রইল কেবল অভি আর ঐশী।
ঐশী ধীরে বলল—
“অভি, তুমি সত্যিই কিছু লুকাচ্ছো না তো আমার থেকে?”
অভি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল আর চুপ করে ঐশীর চোখের দিকে তাকাল। মনে হল, ঝড়ের ভেতরেও ঐশীর উপস্থিতিই তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
অভি একটু সাহস করে বললো “ঐশী… তোমাকে আগেও বলেছি, কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো থেকে আমি পালাতে চাই। কিন্তু সেগুলো আমাকেই তাড়া করে ফিরছে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে -
"জানো, গতকাল আমার প্রথম প্রেম সৃজিতা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছে দেখা করার জন্য। আগেও এড়িয়ে গেছি, আর এখন তো তুমি আমার জীবনের আলো। আমি তাই ভাবছি ইগনোর করবো নাকি গিয়ে শুনবো কি বলতে চায়। আমি তো তাকে ছেড়েছিলাম নাহ্, সে নিজেই কোনও কারণ ছাড়া আমার বিশ্বাস, ভরসা আর প্রেম একসময় ছুঁড়ে ফেলে অন্য একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিলো। তাহলে সে এখন আবার কি চায়?"
ঐশী তার হাত ধরে দৃঢ় স্বরে বলল -
"তুমি গিয়ে দেখো সে কি বলতে চায়। এর জন্য আমি তোমাকে কখনও ছেড়ে যাবো না। তুমি নিশ্চিন্তে যাও অভি।"
ঐশী কাছে এসে দুই হাত দিয়ে অভিকে বুকে জড়িয়ে ধরলো আর মাথায় হাত দিয়ে আদর করতে করতে চোখ বুজে শারীরিকভাবে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো এবং আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো - "আমি তোমারই থাকবো কথা দিচ্ছি বেবী।"
অভি ঐশীকে তার অতীতের ছায়ার সবকিছু বলার পর যেনো মনে থেকে পুরোপুরি হালকা হয়ে গেলো। দুজনেই দুজনের কাছে এখন স্বচ্ছ। আর কোনও লুকানোর কিছু রইলো না।
চলবে…
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন