সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ৩০: নতুন আলাপন

রাত আটটা বেজে গেছে, দুজনে এখনও খুব কাছাকাছি। কিন্তু দুজনেই সেই ম্যাসেজটা নিয়ে দোলাচলে, কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না।

সম্বিৎ ফিরলো দরজার টোকায় - "আসবো"

ঐশী চমকে অভির থেকে কিছুটা সরে গেলো, অভি দরজায় তাকিয়ে দেখলো ভাই।
অভি - "বাবা, তুই আবার কবে এতো ভদ্র হলি রে, দরজায় টোকা মেরে পারমিশন নিচ্ছিস, তাও নিজের দাদার ঘরে!!

ঘরে ঢুকলো এক লম্বা চেহারার, হাসিখুশি যুবক অরিজ।
অরিজ (ঐশীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে মুচকি হেসে) - "তা তো নিতেই হবে। এখন থেকেই তার প্র্যাকটিস করছি!!"

অভি - "বাচালতা ছেড়ে কি বলতে এসেছিস বল!!"

অরিজ - "আমি তোর সাথে দেখা করতে আসিনি রে দাদা, আমি আমার হবু বৌদির সাথে আলাপ করতে এসেছি।" তারপর অভির দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে - "তুই তো আর আলাপ করালি নাহ্!! মায়ের কাছ থেকে শুনে আলাপ করতে এলাম!"
এবার ঐশীর দিকে তাকিয়ে - “এই যে বৌদি প্রার্থী! মায়ের কাছে শুনলাম দেবীর মতো রান্নাঘরে রাজত্ব করছেন। সবাইকে চা বানিয়ে খাইয়েছেন, তো আমি কি চা পাবো না?”

ঘরটা কিছুক্ষণ আগেও একটা দমবন্ধকর আশঙ্কায় ভরে উঠছিলো, অরিজ আসার পরে বাড়িটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

ঐশী (মুচকি হেসে) - "নিশ্চয়ই আমার হবু দেবর, এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি। কাকিমা বলছিলেন, তোমার বউদি হয়ে যাবো—তাহলে চা না খাইয়ে কি ছাড়া যায়? তবে আমি কিন্তু তোমার থেকে অনেক ছোট - তোমার মা বলেছেন। তাই তুমি আমাকে আপনি আজ্ঞে না করে তুমি ডাকলেই আমি খুশি হবো আর নাম ধরেই ডেকো।"

তক্ষুনি মায়ের প্রবেশ। মৈত্রেয়ী দেবী কিছুটা বকুনির ভঙ্গিতে
"না মা, বড়ো হলে কি হবে, সম্পর্কে তো ছোটই হবে। আর ওর দাদা ওর থেকে অনেক বড়ো, তাই তার হবু স্ত্রীকে তার ভাই বৌদি বলেই ডাকবে। এর যেনো অন্যথা না হয়। ওর বাবা এবং আমি দুজনেই এতো আধুনিকতা চাই না।"

অরিজ খিলখিল করে হেসে উঠল—
“দেখো মা, আমি কিন্তু এসে থেকেই আমার হবু বৌদিকে বৌদি ডাকছি। কে জানে, পরেরবার আসতে দেরি করলে আবার বদলে যাবে নাকি!”

মৈত্রেয়ী দেবী পাশে দাঁড়িয়ে বললেন—
“তোর এই ফাজলামো যাবে না অরিজ। তুই শুধু মুখে মুখে খেলাস, আসল সময়ে ঐশীর মতো কেউ যদি পাশে না থাকে, তোরা মানুষ হবি কেমন করে?”

অরিজ মাকে হেসে জড়িয়ে ধরল—
“মা, তুমি তো জানো, আমি কেবল হাসি-ঠাট্টা করতে ভালোবাসি। কিন্তু দাদার জন্য এমন বৌদি যদি পাই, তাহলে তো আমার জীবনও জমে যাবে!”

ঘরভর্তি হাসির রোল উঠল।
অভি দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মনে মনে খুশি হল। অনেকদিন পরে তার ঘরে এমন আনন্দময় পরিবেশ।

ঐশী (লাজুক হেসে) - "দাঁড়াও অরিজ, আমি তোমার জন্য এক্ষুনি চা বানিয়ে আনছি।"

অরিজ - "বৌদি, আমি কিন্তু দাদার মতো নিরামিষ চা খাই না! দুধ, চিনি দিয়ে করে দেবে।"

ঐশী ঠিক আছে বলে রান্না ঘরে চলে গেলো।

কিছুক্ষণ পর ঐশী চা এনে অরিজকে দিলো।

অরিজ (চায়ে চুমুক দিয়ে) - "উফ বৌদি কি চা বানিয়েছো।"

ঐশী (একটু কৌতূহলী দৃষ্টিতে) - "কেনো ভালো হয়নি?"

অরিজ - "মা, আমাদের বাড়ির একজন চা স্পেশালিস্ট এসে গেছে। এবার থেকে প্রতিদিন বৌদি সন্ধ্যাবেলায় আমায় চা খাওয়াবে।"

মা - "হ্যাঁ, ওটাই বাকি আছে। তোর বৌদির আর কলেজ নেই, পড়া নেই, আর অন্য কোনও কাজ নেই, তোর জন্য সন্ধ্যাবেলায় এসে নাকি বাড়িতে চা বানিয়ে খাওয়াবে! শখ কতো!"

অরিজ - "সেটা তো দাদার উপর ডিপেন্ড করছে। কবে দাদা পাকাপাকি ভাবে হবু বৌদিকে আমার নিজের বৌদি করবে।"

কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে আড্ডায় বসল। ছোটখাটো খুনসুটি, গল্প, স্মৃতিচারণা—মনে হচ্ছিল সংসারে আবার আলো ফিরে এসেছে।

কিন্তু রাত বাড়তে থাকল। একে একে সবাই ঘর ছেড়ে গেল। অরিজ চলে গেল নিজের ঘরে, অভির বাবা টিভি দেখতে বসলেন, মা রান্নাঘরে কাজ শেষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ঘরে রইল শুধু অভি আর ঐশী।
টেবিলে পড়ে থাকা অভির মোবাইলটা তখনও স্ক্রিনে আলো ছড়াচ্ছে। ঐশীর দৃষ্টি বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছিল।

অভি চুপচাপ মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।
সেই মেসেজটা এখনও অক্ষত—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

অভির চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
ঐশী অভির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
“অভি, কিছু লুকাচ্ছো না তো আমার থেকে?”

অভি গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
“ঐশী… কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো থেকে আমি পালাতে চাই। কিন্তু সেগুলো আমাকেই তাড়া করে ফিরছে।”

অভির চোখে ভেসে উঠল দ্বন্দ্ব, মনের ভেতর ঢেউ।
ঐশী চেয়েছিল আজকের সন্ধ্যেটা হোক শুধু দুজনার—
কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের সেই বার্তা তাদের নিঃশব্দ ভালোবাসার মাঝেই এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিল।

ঐশী ধীরে তার হাত ধরে বলল—
“তুমি যদি পালাও, আমি তোমাকে আবার টেনে আনব। তুমি একা নও অভি, আমি আছি। আর আমার থেকে তোমাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না”

ঐশী অভিকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। দুজনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে একে অপরকে আঁকড়ে ধরলো।
ঐশী (মৃদু কন্ঠে) - "এই আমি তোমাকে আমার বুকে আঁকড়ে ধরলাম। দেখি কে আমার থেকে আমার অভিকে ছিনিয়ে নেয়।"

রাত প্রায় নটা -
অভি (আবেগ কন্ঠে) - "রাত হচ্ছে, তোমাকে তো ফিরতে হবে।"

ঐশী (খুব হালকা স্বরে) - "হ্যাঁ গো, কাল আবার কলেজ আছে। আমি চাই তুমি আমাকে খুব শিগগির এই বাড়িতে নিয়ে আসো। যাতে তোমাকে ছেড়ে আর যেতে না হয়। আমার তোমাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না।"

অভি (মৃদু কন্ঠে) - "আমিও তাই চাই। আমিও তোমাকে আর ছেড়ে থাকতে পারছি না।"

দুজনে আলিঙ্গনমুক্ত হলো। ঐশী বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে বাড়ির সবাইকে বলে বেরিয়ে গেলো।

এদিকে অভি সৃজিতার সেই ম্যাসেজটা নিয়ে চিন্তামগ্ন হয় পড়লো।

চলবে…

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...