সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ২৯: প্রেমের টান

রাত যত গাঢ় হয়, সৃজিতার অস্থিরতা ততই বাড়তে থাকে।
ঘরে শুয়ে থাকা মেয়েটার ঘুমন্ত মুখ দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।
“ওর জন্যই তো আমি লড়ছি… তবুও কেন মনে হচ্ছে আমার ভেতরে এত শূন্যতা?”

মোবাইল হাতে নিয়ে আবারও খুলল সেই খবর—অভিনব আর পাশের মেয়েটির ছবিটা।
মেয়েটির হাসি, ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত আর অভির আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি—সবকিছু যেন সৃজিতাকে তাড়া করছে।

হঠাৎ করেই বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
“যখন অভির কিছুই ছিল না, তখন আমি তাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম।
আজ যখন অভি আলোয় ভরে উঠেছে, তখন কেন আমি আবার তার দিকে টান অনুভব করছি? এটা কি ন্যায়সঙ্গত?”

পরেরদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে—
অভিনব তখন নিজের ঘরে খাতা খুলে বসে আছে। আর ঐশী অভির বাড়িতে....

অভির মা ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যে দিতে গেছেন। বাবা বারান্দায় বসে রাস্তা দেখছেন।
ঐশী নিজের উদ্যোগে নিজের বাড়ি মনে করে সবার জন্য চা বানাচ্ছে রান্নাঘরে।

কিছুক্ষণ পর মৈত্রেয়ী দেবী ঠাকুর ঘর থেকে ডাইনিং রুমে এসে দেখলেন ঐশী সবার জন্য চা বানিয়ে টেবিলে রাখছে।
বললেন - "একি মা, তুমি আবার এসব করতে গেছো কেনো? আমি তো সন্ধ্যা দিয়ে এসে তোমাদের জন্য চা করতাম!!"

ঐশী - "তাতে কি হয়েছে কাকিমা, আমি তো এখন নিজেকে এই বাড়িরই একজন মনে করি। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমাকে এখন হয়তো বাড়ি চলে যেতে হয়, কিন্তু আপনাদের বিশ্বাস, ভরসা আর আশীর্বাদ থাকলে আমি তো ভবিষ্যতে আপনাদেরই একজন হবো।"

অভির মা (আবেগতাড়িত হয়ে) - "আচ্ছা ঠিক আছে মা, তুমি যেটা ভালো মনে করো, কোরো নিজের মনে করে, আমি আর কিছু বলবো না।"
কিছুক্ষণ থেমে - "আচ্ছা মা, তোমার সাথে তো বাড়ির আরেকজনের আলাপ হওয়া বাকি।"

ঐশী - "কে কাকিমা?"

মা - "আমার ছোট ছেলে, তোমার অভির ছোট ভাই অরিজের সাথে।"

ঐশী - "হ্যাঁ কাকিমা, গতকাল সকালে আমি বাড়িতে ঢোকার সময় দেখেছি ওকে!"

মা - "হ্যাঁ, ও আসবে সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ। তুমি ততক্ষণ থাকলে দেখা হয়ে যাবে। তবে আমরা তোমার ব্যাপারে ওকে কিছু জানাইনি। আসলে বলবো।" তারপর মৃদু হেসে - "ভেবেছি সামনাসামনি ওর হবু বৌদির সাথে আলাপ করিয়ে দেবো।"

ঐশী (লাজুক হেসে) মাথা ঝুঁকিয়ে সবার জন্য চা পরিবেশন করতে করতে বললো - "ঠিক আছে।"

মা - "তুমি তো এখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার, তাহলে তোমার বয়স বছর কুড়ি বা একুশ হবে! কি তাইতো?"

ঐশী - "হ্যাঁ, কাকিমা।"

মা - তাহলে তোমার হবু দেওর তোমার থেকে প্রায় ন'বছরের বড়ো। ও ওই চাকরিটাই যা ঠিকঠাক করে, এছাড়া বাচ্চা বাচ্চা ভাবটা রয়েই গেছে, তোমাদের মতো পরিপক্কতার খুব অভাব। আর ভীষণ ফক্কর।" কিছুক্ষণ থেমে - "আমার ছেলে বলে বলছি না,  এমনিতে আমার ছোট ছেলে খুব ভালো, লোকের বিপদে পাশে দাঁড়ায়, সবাই ওকে ভালোবাসে, মনে কোনও রকম কোনো প্যাঁচ নেই। মনে যেটা আসে বলে দেয়, কিন্তু যাকে বলছে, সে কিছু ভাবতে পারে ওর কথায়, সেসব মাথায় থাকেনা।"

ঐশী - "কাকিকা আমি কাকুকে গিয়ে চা দিয়ে আসছি।"

মা (একটু খুশি মনে) - "ঠিক আছে মা।"

ঐশী চা নিয়ে অভির বাবাকে বারান্দায় গিয়ে দিয়ে বললো - "কাকু চা। আমি বানিয়েছি, খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে?"

অভির বাবা চা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে ঐশীর দিকে তাকিয়ে বললেন - "তুমি কি বাড়িতেও চা বানাও?"

ঐশী - "বাড়িতে থাকলে আমিই বানাই।" কিছুক্ষণ চুপ করে, "এটা কেমন হয়েছে কাকু?"

অভির বাবা - "বেশ ভালো।"

ঐশী (নিশ্চিন্তের মৃদু হাসিতে) - "ধন্যবাদ কাকু" বলে ডাইনিং রুমে ফিরে এসে মৈত্রেয়ী দেবী (অভির মা)-কে চা বাড়িয়ে দিলো।

মৈত্রেয়ী দেবী চা নিয়ে ইন্দ্রনাথ বাবুর কাছে যাওয়ার সময় ঐশীকে বললেন - "যাও মা, অভির চা-টা নিয়ে অভির কাছে যাও, আমি তোমার কাকুর কাছে যাচ্ছি।"

অভির ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু বন্ধ করে চুপচাপ চেয়ার টেনে তার পাশে বসল।

“অভি…”
অভি মাথা তুলল।
“চা নাও।" কিছুক্ষণ থেমে "তুমি জানো, তোমার জীবনে আমার কত বড় ভূমিকা সেটা আমি কাউকে দেখাতে চাই না। শুধু চাই, তুমি যেন আর একা না থাকো।”

অভির ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল, চায়ে এক চুমুক দিয়ে - বাহ্ চা তো দারুণ করো তুমি!"

ঐশী খুশি হয়ে একটু নাটকীয়ভাবে - "থ্যাঙ্ক ইউ ডার্লিং।"

দুজনে চা খাওয়া সম্পূর্ণ করে, একটু সাহিত্য নিয়ে আলাপচারিতা করলো।

তারপর অভি -
“ঐশী, তুমিই তো আজ মানসিকভাবে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়েছো। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।”

ঐশীর চোখে তখন এক নিবিড় আলো।
সে জানে—এই মুহূর্তে অভি তাকে নিজের ভেতর ঢুকতে দিয়েছে। দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে - তারা যেনো দুজনেই কোন এক অজানা কাল্পনিক প্রেমালাপে ডুব দিয়েছে।

সন্ধ্যা নেমেছে - দুজনে আরও কাছাকাছি। অভি নিজের চেয়ারে বসে টেবিলে নিজের লেখা দেখছে। ঐশী এসে পাশে দাঁড়িয়ে অভির লেখা দেখে মুগ্ধ চোখে লেখা দেখছে আর অভির দিকে তাকাচ্ছে।

অভি - "ঐশী তোমাকে আর ছেড়ে থাকতে পারছি না"

ঐশী আরও কাছে এসে দাঁড়িয়ে অভিকে নিজের বুকে টেনে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো। মাথা নিচু করে অভির দিকে তাকিয়ে, অভির চুলে নিজের কোমল আঙুল বোলাতে বোলাতে বললো - "আমিও না গো, অভি! তুমি শুধু আমার, তোমার উপর শুধু আমারই অধিকার। আমি তোমাকে এভাবেই আগলে রাখবো, তুমি দেখো অভি।"

কিন্তু ঠিক তখনই—
অভির ফোনে এক অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ ভেসে উঠল।

অভি ঐশীর বহুবন্ধ থেকে মাথা সড়িয়ে দেখলো হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ। রাত প্রায় আটটা। শব্দগুলো ছোট, অথচ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো—
“অভি, আমি রুমা… মানে সৃজিতা। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। এইবার আর এড়িয়ে যেও না।”

অভির বুক ধক করে উঠল। ঐশী অভির মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে আন্দাজ করতে পারলো যে অভিনব ম্যাসেজটা দেখে একটু চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছে, কিন্তু ঐশী তেমন কোনও কৌতূহল দেখালো না, তবে জিজ্ঞেস করল - "কিছু কি সমস্যা হয়েছে?"

অভি কথাটা গোপন রেখেই বললো - "তেমন কিছু না।"

তবে ঐশী মনে মনে ভাবল—
“মনেহচ্ছে ভাগ্য সত্যিই আমাদের প্রেমের কিছু পরীক্ষা নিতে চলেছে।”

নিস্তব্ধতায়, দুই ভিন্ন ঠিকানায় দুটো মানুষ—অভি আর সৃজিতা— অস্থিরতার ভেতর হারিয়ে গেল।

চলবে…

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...