ইন্দ্রনাথবাবু চেয়ার টেনে বসে আছেন। হাতে সাদা রুমাল, মাঝেমধ্যে কাশির ঝাঁকুনিতে শরীর কেঁপে উঠছে। কিন্তু চোখের ভেতরে এক অদ্ভুত টান—সিদ্ধান্তহীনতা।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
“মৈত্রেয়ী, মেয়েটি খারাপ নয়। চোখেমুখে ভরসা আছে। তবে ভরসা কি সংসার টানার জন্য যথেষ্ট?”
মা শান্ত স্বরে জবাব দিলেন—
“তাহলে কি সমাজের ভয়েই আমরা ছেলের জীবন থামিয়ে রাখব? অভি যত কষ্ট করেছে, সেই কষ্ট কি আমরা ভুলে গেছি? আজ যদি ওর জীবনে একটু আলো আসে, তবে সেটা কেড়ে নেওয়া ঠিক হবে? আর সংসারের কথা বলছো, আমিও যখন এই সংসারে এসেছিলাম, তখন কি আমিও জানতাম যে এই সংসার প্রায় ৪০ বছর টানতে পারবো? সেই সময় আমার শ্বাশুড়ি আমায় শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়েছিলেন আর ঐশীর ক্ষেত্রেও আমি শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবো। তুমি চিন্তা কোরো না।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সমাজের কথা না ভেবেও কি থাকা যায়? আত্মীয়-স্বজন সবাই মুখে আঙুল তুলবে। আর ঐশীর বাবা-মা? তারা যদি অসম্মতি জানায়?”
অভি এতক্ষণ চুপ ছিল, এবার দৃঢ় গলায় বলল—
“বাবা, আমি জানি তুমি চিন্তিত। কিন্তু তোমাকে একটা প্রশ্ন করি—আমাদের খারাপ সময়ে, যখন তুমি অসুস্থ, আর সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, তখন আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের কেউ কি এসে বলেছিল, ‘আমরা আছি?' আজ তারা যদি আঙুল তোলে, আমি কাউকে অসন্মান না করেই বলছি—তাতে কিছু যায় আসে না।”
কথাটা শুনে ইন্দ্রনাথবাবু গম্ভীর হলেন। তাঁর চোখে এক মুহূর্তের জন্য অশ্রু চিকচিক করে উঠলো।
“তুই ঠিকই বলছিস, অভি। সমাজ কোনোদিন আমাদের দায় টানেনি। তবু… আমি চাই না তুই তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত নে। তোর জীবনটা অনেক বড়।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
ঠিক তখনই বারান্দার জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো সকালের হালকা রোদ। মা চোখ তুলে তাকালেন।
“আলো ঢুকছে, বুঝলি? অন্ধকার চিরদিন থাকে না। হয়তো এই আলোই তোর জীবনে নতুন সূচনা আনবে।”
অভি চুপ করে মাথা নোয়াল। বাবার চোখে এবার একটু নরম ভাব।
বাইরে শ্যামবাজারের গলিতে তখন ভাঙা ছাদের উপর দিয়ে পায়রা উড়ে যাচ্ছিল। ভেতরে অভি বুঝলো—এ লড়াই শুধু প্রেমের নয়, এটা তার নিজের পরিবারকেও নতুন করে গড়ে তোলার লড়াই।
চলবে…
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন