এখন সকাল ছটা
অভির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় ঐশীর বুকের ভেতর হালকা ধুকপুকানি। সকাল হয়ে গেলেও দিনের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রাস্তায় লোক কম, নিজের পদশব্দও শোনা যাচ্ছে।সে মনের ভেতর একদিকে স্বস্তি—অভির মা তাঁকে মেনে নিয়েছেন, আবার অন্যদিকে ভয়—নিজের মা–কে কীভাবে সব বলবে?
কাউকে না বলেই বেরিয়ে যাওয়াতে নিজেদের বাড়ির সদর দরজাও ভিতর থেকে খোলা ভেবে দরজা ঠেলে খুলতে গিয়ে ঐশী দেখলো, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। বুঝলো তার মা বন্ধ করেছে নিশ্চয়ই।
দুবার কলিং বেল বাজানোর মিনিট খানেক পর দরজা খুলে গেলো - সামনে তার মা।
মা: “ঐশীর দিকে চেয়ে - বলি এতো সকালে কোন রাজকার্য করে ফেরা হচ্ছে শুনি? আর দরজা খুলে রেখে চলে গেছিস, অন্তত আমাকে তো বলে বেরোতে পারতিস?"
ঐশী থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর যেন ধপাস করে শব্দ হলো। মা এগিয়ে এসে তাকালেন, মেয়ের চোখে অদ্ভুত দীপ্তি দেখে কিছুটা অবাক হলেন। মেয়েকে ঘরে ঢুকতে দিয়ে দরজা আবার আটকে দিলেন। ঐশীর পিছন পিছন যেতে যেতে -
মা (সন্দেহ নিয়ে): “তা বলি রাজকার্য করতে কখন বেরোনো হয়েছিলো?”
ঐশী ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে দ্বন্দ্ব—বলবে, না লুকোবে?
সত্য স্বীকার
অবশেষে ধীরে ধীরে কাঁপা গলায় বলল— “মা… আমি অভির বাড়ি গিয়েছিলাম।”
তৎক্ষনাৎ মা - "কে অভি?"
ঐশী - "মা, অভি মানে বিখ্যাত সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত।"
মায়ের চোখ বড় হয়ে গেল। মা (কঠোর স্বরে): “অভির বাড়ি? তোমার থেকে কতো বড়ো তিনি, তুমি তাকে নাম ধরে সম্বোধন করছো!! এই শিক্ষা দিয়েছি আমরা তোমাকে? তাও এতো সকালে? কেন? কি এতো প্রয়োজন ছিলো, যে কাউকে কিছু না জানিয়ে এতো ভোরে তার বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লো?”
ঐশী চোখ নামিয়ে নিল। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলল— “কারণ আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারছি না মা। আমি অভিকে ভালোবাসি - মানে আমরা দুজনেই দুজনকে খুব ভালোবাসি। আজ অভির মায়ের সামনে সব স্বীকার করেছি।”
মায়ের প্রতিক্রিয়া
কিছুক্ষণ ঘর নিস্তব্ধ। শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে বিস্ময়, দুশ্চিন্তা আর এক ধরনের অজানা ভয়।
মা (গম্ভীর গলায়): “ঐশী, তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কী কথা বলছো? অভিনব গুপ্ত একজন কত বড়ো বিখ্যাত ব্যক্তি, আর সবথেকে আসল কথা হলো তোমার থেকে উনি অনেকটা বড়ো… লোকের চোখে কীভাবে দেখাবে? তুমি এখনও কলেজে পড়ছো।”
ঐশীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে মায়ের হাত ধরে বলল— “আমি সব জানি মা। বয়সের ফারাক আছে, লোকে কথা বলবে। কিন্তু আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। ও-ই আমার ভরসা, আমার ঘর।”
মায়ের নীরবতা
মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মা (আবেগ চেপে): “তুমি ছোট্ট থেকে যেটা চেয়েছো আমি সব পূর্ণ করেছি। কিন্তু এই ব্যাপারটা… এটা খুব সহজ নয় মা। সমাজ, লোকজন, বাবার রাগ—সবই ভাবতে হবে।”
ঐশী ভিজে চোখে ফিসফিস করে বলল— “আমি শুধু তোমার আশীর্বাদ চাই মা। তোমরা পাশে থাকলেই সব সামলে নেব।”
মা নীরবে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। তাঁর চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন মেয়ের দৃঢ়তায় একরাশ গর্বও।
চলবে....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন