রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

পর্ব ২৭: অচেনা সংসার

সময় গড়িয়েছে অনেক দূর।
সৃজিতার জীবনে এখন বাহ্যিক পূর্ণতার অভাব নেই—শ্বশুরবাড়ির ঐশ্বর্য, দিব্যেন্দুর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা, মেয়ের হাসিমাখা মুখ—সবই আছে। তবু অদ্ভুত এক শূন্যতা তার চারপাশে ছায়া ফেলে রেখেছে।

দিব্যেন্দু প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরে। কখনো কাজের ব্যস্ততা, কখনো ক্লায়েন্ট মিটিং। সংসারে তার অবদান অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। রুমা (সৃজিতা) কখনো মনে মনে ভাবে—
“আমার চারপাশে এত মানুষ, এত কোলাহল… তবুও আমি একা কেন?”

মেয়েকে এখন থেকেই একটি প্রি-স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট মজার ছড়া আধো আধো উচ্চারণে 0মুখস্থ করে মাকে শোনায়। সৃজিতা হাসিমুখে শোনে, কিন্তু মাঝে মাঝে বুকের ভেতর চাপা দীর্ঘশ্বাস জেগে ওঠে।

একদিন সকালের কাগজ হাতে নিয়ে বসে থাকতে গিয়ে চোখে পড়ল বড় হেডলাইন—
“অভিনব গুপ্ত: বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের মুখ এবার New India Foundation Fellowship Award এর জন্য নমিনেটেড হয়েছে।”
সাথে ছাপা আছে অভির ছবি—আত্মবিশ্বাসী হাসি, গলায় নতুন প্রজন্মের তুমুল প্রশংসা।

সৃজিতার হাত কেঁপে উঠল।
এই কি সেই অভি, যাকে একসময় নিজের হাত থেকে ছেড়ে দিয়েছিল?
যে অভিকে সে একসময় বলেছিল— “তোমার চোখে আমি ভবিষ্যৎ দেখি”—
সেই অভি আজ ভবিষ্যৎকেই জয় করে নিয়েছে।

সন্ধ্যায় শাশুড়ি বলছিলেন,
“দিব্যেন্দু তো খুব ব্যস্ত, রুমা। সংসারের সব দায়িত্ব তোমার কাঁধে এসে পড়ছে। তবে মেয়েটাকে ঠিক মতো মানুষ করাই তোমার আসল কাজ।”

সৃজিতা চুপচাপ মাথা নাড়ল। বাইরে গৃহবধূ, ভেতরে অস্থির নারী। অভির নাম এখন তার কাছে শুধু অতীতের নয়, বর্তমানেরও প্রতিধ্বনি।

রাতে শুয়ে থাকতে থাকতে সৃজিতা মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি সত্যিই ভুল করেছিলাম? ঐশ্বর্য বেছে নিয়ে কি আমি আমার সত্যিকারের সুখ হারিয়েছি?”

উত্তর মেলেনি।
কেবল জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশে যেন হারানো ভালোবাসার ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছিল।

চলবে…

পর্ব ২৬: বাবার নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব

ঐশীর চলে যাওয়ার পর ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। অভি চুপচাপ বারান্দার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মা রান্নাঘরে ফিরে গেলেও হাতের কাজ থেমে গেছে বারবার, মনে মনে শুধু ঐশীর কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।

ইন্দ্রনাথবাবু চেয়ার টেনে বসে আছেন। হাতে সাদা রুমাল, মাঝেমধ্যে কাশির ঝাঁকুনিতে শরীর কেঁপে উঠছে। কিন্তু চোখের ভেতরে এক অদ্ভুত টান—সিদ্ধান্তহীনতা।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
“মৈত্রেয়ী, মেয়েটি খারাপ নয়। চোখেমুখে ভরসা আছে। তবে ভরসা কি সংসার টানার জন্য যথেষ্ট?”

মা শান্ত স্বরে জবাব দিলেন—
“তাহলে কি সমাজের ভয়েই আমরা ছেলের জীবন থামিয়ে রাখব? অভি যত কষ্ট করেছে, সেই কষ্ট কি আমরা ভুলে গেছি? আজ যদি ওর জীবনে একটু আলো আসে, তবে সেটা কেড়ে নেওয়া ঠিক হবে? আর সংসারের কথা বলছো, আমিও যখন এই সংসারে এসেছিলাম, তখন কি আমিও জানতাম যে এই সংসার প্রায় ৪০ বছর টানতে পারবো? সেই সময় আমার শ্বাশুড়ি আমায় শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়েছিলেন আর ঐশীর ক্ষেত্রেও আমি শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবো। তুমি চিন্তা কোরো না।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সমাজের কথা না ভেবেও কি থাকা যায়? আত্মীয়-স্বজন সবাই মুখে আঙুল তুলবে। আর ঐশীর বাবা-মা? তারা যদি অসম্মতি জানায়?”

অভি এতক্ষণ চুপ ছিল, এবার দৃঢ় গলায় বলল—
“বাবা, আমি জানি তুমি চিন্তিত। কিন্তু তোমাকে একটা প্রশ্ন করি—আমাদের খারাপ সময়ে, যখন তুমি অসুস্থ, আর সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, তখন আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের কেউ কি এসে বলেছিল, ‘আমরা আছি?' আজ তারা যদি আঙুল তোলে, আমি কাউকে অসন্মান না করেই বলছি—তাতে কিছু যায় আসে না।”

কথাটা শুনে ইন্দ্রনাথবাবু গম্ভীর হলেন। তাঁর চোখে এক মুহূর্তের জন্য অশ্রু চিকচিক করে উঠলো।

“তুই ঠিকই বলছিস, অভি। সমাজ কোনোদিন আমাদের দায় টানেনি। তবু… আমি চাই না তুই তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত নে। তোর জীবনটা অনেক বড়।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।

ঠিক তখনই বারান্দার জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো সকালের হালকা রোদ। মা চোখ তুলে তাকালেন।
“আলো ঢুকছে, বুঝলি? অন্ধকার চিরদিন থাকে না। হয়তো এই আলোই তোর জীবনে নতুন সূচনা আনবে।”

অভি চুপ করে মাথা নোয়াল। বাবার চোখে এবার একটু নরম ভাব।

বাইরে শ্যামবাজারের গলিতে তখন ভাঙা ছাদের উপর দিয়ে পায়রা উড়ে যাচ্ছিল। ভেতরে অভি বুঝলো—এ লড়াই শুধু প্রেমের নয়, এটা তার নিজের পরিবারকেও নতুন করে গড়ে তোলার লড়াই।

চলবে…

পর্ব ২৫: অভির বাড়ির আলো–আঁধার

অভির বাড়িতে তখন সকাল গড়াচ্ছে। বারান্দা ভরে উঠেছে পাখির ডাক, ভেতরে মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, আর ছোট ভাই অরিজ তাড়াহুড়ো করছে অফিস যাওয়ার জন্য।

অভি নিজের ঘরে বসে ভাবছে, ঐশী তার বাবাকে সব জানিয়েছে—এই খবর তাকে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে ফেলেছে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন অভির বাবা। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাশিটা যেন ক্রমেই বাড়ছে। শরীরে সেই জোর আর নেই, তবুও মুখে সেই চেনা দৃঢ়তা।

বাবা (গম্ভীর স্বরে):
“অভি, তোর মা বলছিলো তুই নাকি কলেজের এক মেয়েকে বিয়ে করার কথা ভেবেছিস। সত্যি?”

অভি চমকে তাকাল, কিন্তু শান্ত গলায় বলল—
“হ্যাঁ বাবা। ওর নাম ঐশী। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় এক সেমিনারে। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।”

অভির মা রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামলাতে চাইলেন।
“শোনো, আবেগে কিছু বোলো না। আগে ওকে একটু সময় দাও।”

কিন্তু বাবা থেমে থাকলেন না।
“ভালোবাসা মন্দ নয়। কিন্তু ও তো বয়সে তোর থেকে অনেক ছোট।”

অভি মৃদু গলায় বললো - "হ্যাঁ বাবা।"

বাবা চিন্তিত গলায় - "আমরা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু মেয়েটার বাবা-মা কি রাজি হবেন? সামাজিক বিষয়টাও তো ভেবে দেখা উচিৎ।"

অভি দৃঢ় গলায় বলল—
“সমাজ কি আজ পর্যন্ত আমার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে?” একটু থেমে - "আচ্ছা বাবা তুমিই বলো, আমাদের খারাপ সময়ে কেউ কি কখনও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে? - বাড়ায়নি তো, তাহলে আমরা কেনো সমাজের কথা ভাববো!! আর তাছাড়া আমরা তো কোনও বেআইনি কাজ করিনি বা করছিও না। হ্যাঁ মানছি যে আমাদের দুজনের বয়সের ফারাক আছে, কিন্তু ও আর আমি দুজনেই কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক। তাই দুজনেরই জীবন নিজেদের মতো করে ভাবার অধিকার আছে।"

ঘর নিস্তব্ধ। বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“কথাটা ভুল বলিসনি। তবে আমার ভয় একটাই—তুই যেন ভুল পথে না হাঁটিস।”

অভির ভাই এসব কানেই তোলেনি অফিসে যাওয়ার তাড়ায় বা এখনও জানেই না। বেরোবার আগে অরিজের কন্ঠস্বর - "আমি বেরোচ্ছি।"

মা - "আয় বাবা। অফিস ছুটির পর ডাইরেক্ট বাড়ি আসবি, কোথাও আড্ডা মারতে বসিস না।"

অরিজ: "আরে না মা, সারাদিন কাজের পর আর ভালো লাগে নাকি, আমি বাড়িতেই আসবো।"

ঠিক তখনই সদর দরজায় কলিং বেল বাজলো। অরিজ দরজা খুলেই দেখলো ঐশী দাঁড়িয়ে মুখোমুখি অরিজ। ঐশী ঢুকবে, অরিজ বেরোবে। ঐশীর চোখ ভেজা, কিন্তু মুখে সাহসী অভিব্যক্তি।

অরিজ সামনা সামনি এরকম একজন সুন্দরী মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে গেলো, বললো - "আ..আপনি কাকে চান?"

মা: "কে এসেছে?"

অরিজ: কৌতূহলী চোখে "দেখো তো উনি বোধহয় কাউকে খুজছেন!" বলে অরিজ বেরিয়ে গেলো পাশ দিয়ে।

ঐশী ভেতরে ঢুকে এলো - "আমি কাকিমা।"

মা: "এসো মা, এসো এসো।"

ইন্দ্রনাথ বাবুর (অভির বাবা) দিকে তাকিয়ে মৈত্রেয়ী দেবী (অভির মা) একটু হাসিমুখ করে বললেন - "এই যে তোমার অভির পছন্দ, দেখো তো কেমন পছন্দ তোমার ছেলের?"

সে বাবার সামনে হাত জোড় করে পায়ে দুহাত দিয়ে প্রণাম করে বলল—
“প্রণাম কাকু। আমি জানি আপনি চিন্তিত। কিন্তু আমি অভিকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আপনি যদি একবার আমাকে সুযোগ দেন, আমি প্রমাণ করব—অভির পাশে থাকার মতো শক্তি আমার আছে।”

অভির বাবা মেয়েটির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রাখলেন। সেখানে ভয় নেই, আছে দৃঢ়তা।

মা পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন—
“দেখো তো, মেয়েটার চোখে কি নিষ্ঠা নেই?”

বাবা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বারান্দার দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুধু বললেন—
“সময় লাগবে। এখনই কিছু বলছি না। তবে তোমাদের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেব।”

অভির বুক হালকা হলো। ঐশী মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখে ভরসার জল নেমে এলো।

ঘরের ভেতর আলো–আঁধারের মাঝেই নতুন এক লড়াইয়ের সূচনা হলো।

চলবে…

পর্ব ২৪: বাবার সামনে সত্য

সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়লেও ঐশীদের বাড়িতে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে এসেছে। ঐশী তাদের ডাইনিং রুমের এক কোণে চুপচাপ বসে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মা তখনো ঘরের একপাশে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর ঠোঁট যেন সিল করা। ঘরের ভেতর বাতাস যেন থমথমে।

ঠিক তখনই ঐশীর বাবা ঘুম থেকে উঠে এলেন এবং কোনও দিকে না তাকিয়ে সকালের সমস্ত দৈনন্দিন অভ্যাস সারতে লাগলেন। সবকিছু হয়ে গেলে অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে স্ত্রী'কে তার প্রাতঃরাশ দেওয়ার জন্য বলে ডাইনিং টেবিলে এসে দৈনন্দিন পত্রিকা নিয়ে বসলেন আর সাথে টিফিনটাও তার অফিসব্যাগে গুছিয়ে দিতে বললেন।

ঐশীর মা গম্ভীর মুখে ঋদ্ধিমান বাবুর (ঐশীর বাবা) সামনে প্রাতঃরাশ দিয়ে টিফিন ব্যাগে দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে টেবিলের আরেক প্রান্তে এসে বসলেন।

বাবা কাগজ পড়তে পড়তে (হালকা বিরক্ত স্বরে):
“আজকাল যে কি সব হচ্ছে, কাগজ খুললেই হেডলাইন শুধু ধর্ষণ, খুন, পরকীয়া এসব। ভালো কোনও খবর থাকেনা, ধুর!! তবে একটা খবর খুব ভালো লাগলো, একজন বাঙালি সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত New India Foundation Fellowship Award এর জন্য নমিনেটেড হয়েছে। এই অঞ্চলের ছেলে। খুব ট্যালেন্ট আছে বলতে হবে। যদিও আমি খুব একটা সাহিত্য চর্চা করার সময় পাইনা। তবুও আমাদের অঞ্চলের নাম তো উজ্জ্বল করছে।" বলে কাগজ পাশের চেয়ারে রেখে দিলেন।

বাবার মুখে 'অভিনব গুপ্ত' নামটা শুনেই ঐশীর বুকটা ধক করে উঠলো; ঐশী আর তার মা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো।

প্রাতঃরাশ খেতে খেতে - "কি ব্যাপার, আমি এতো সব কথা বলছি, অথচ দুজনেই এতো চুপচাপ!!"

তারপর ঐশীর দিকে তাকিয়ে কি ব্যাপার ঐশী মা, তুমি এত সকাল সকাল উঠে পড়েছো যে!!" খাওয়ার মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ থেমে "ওই কোনায় বসে আছো কেনো, দিদি(অর্পিতা) বা বোন(ঈশা) এর সাথে সাত সকালে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?" তারপর স্ত্রীয়ের দিকে তাকিয়ে "নাকি মা বকা দিয়েছে?"

ইন্দ্রানী দেবী (ঐশীর মা): হ্যাঁ, তুমি তো কেবল আমাকে ওদের বকতেই দেখো!"

এদিকে ঐশীর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। মায়ের চোখ তাঁর দিকে ছুটে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ঐশী ধীরে ধীরে দাঁড়াল।

ঐশী (কাঁপা গলায়):
“বাবা… একটা কথা বলতে চাই।”

বাবা (চশমার ফাঁক দিয়ে কড়া দৃষ্টি ছুঁড়ে):
“বল! কিন্তু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নয়।”

ঐশী গভীর শ্বাস নিল। গলার স্বর যেন আটকে যাচ্ছিল—
“আমি… আমি ভোরবেলা অভির বাড়ি গিয়েছিলাম।”

বাবা খানিকক্ষণ চুপ থেকে - "অভি আবার কে মা?"

ঐশী: "বাবা তুমি যার কথা কিছুক্ষণ আগে বলছিলে, অভিনব গুপ্ত।"

বাবা (বিস্ময়ে মেয়ের দিকে চেয়ে):
“কি বললি? অভিনব গুপ্তর বাড়ি? উনি তো একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, আর তুই ভোর ভোর ওর বাড়ি? কেন? তুই চিনিস তাকে? পরিচয় আছে?”

ঐশী: হ্যাঁ, আছে বাবা!! আমাদের কলেজে এক সেমিনারে এসেছিলো, আমি নিজে তার সাথে পরিচয় করি। মাঝে মাঝেই আসে। তার জীবনীমূলক একটি উপন্যাস পড়ে, তার ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম।"

বাবা: "সে তো ভালো কথা! কিন্তু সেটার সাথে এই ভোরবেলায় তার বাড়ি যাওয়ার কারণটা কি?"

ঐশীর চোখে জল ভরে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“কারণ আমি অভিকে ভালোবাসি, বাবা। আর সেও আমাকে ভালোবাসে। বেশ কয়েকদিন যাবৎ আমরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছি। আজ আমরা দুজনেই ভোরে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, যে দুজনেই একে অপরের পরিপূরক। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।”

মুহূর্তে ঘর ভারী হয়ে গেল। যেন সময় থমকে দাঁড়াল।

ঐশীর বাবা (অবাক বিস্ময়ে): "কিন্তু, সে তো তোর থেকে বয়সে অনেক বড়ো। আর ওরা বিখ্যাত ব্যক্তি, ওদের লাইফ স্টাইল আর আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের লাইফ স্টাইলে অনেক ফারাক। ওদেরকে কেউ কিছু বলতে পারবে না, কিন্তু আমাদের পাড়া প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়-স্বজন এরা কি বলবে!"

ঐশীর মা: "তুমি একটু শান্ত হও। এখন এসব না ভেবে অফিস যাও, ফিরে এসব কথা ভাবা যাবে।"

ঠিক তখনই দরজা থেকে বেরিয়ে এলো অর্পিতা, বড় বোন। "কি হয়েছে?"

বাবা: "তোমার বোনকে বোঝাও, যা করছে ঠিক করছে না।"

অর্পিতা: "কি হয়েছে রে বুনু!!"

ঐশী: "দি-ভাই, আমি আর সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছি। অভির মা'ও আমাকে অভির স্ত্রী করতে চায় বলে সম্মতি দিয়েছেন।"

অর্পিতা (সাবধানে):
“বাবা, তুমি এখন একটু শান্ত হয়ে অফিস যাও, ফিরে এসে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা যাবে এটা নিয়ে। কিন্তু ঐশী হুট করে এসব বলেনি বাবা। আমি বেশ কয়েকদিন ধরে ওর মধ্যে পরিবর্তন টের পাচ্ছিলাম।”

বাবা (কর্কশ স্বরে):
“চুপ কর অপা (অর্পিতার ডাক নাম)! পড়াশোনায় মন দে। নিজের মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে ভাব, এবার তোর ফাইনাল। প্রেমের ভূত তোমাদের রক্তে কে ঢুকিয়ে দিল?”

অর্পিতা মাথা নিচু করল। কিন্তু চোখে বোনের জন্য এক ধরণের উদ্বেগ ঝরে পড়ছিল। ইতিমধ্যে ছোট বোন ইশা এসে সব চুপচাপ শুনছিলো। সব শুনে মুখে সরল হাসি।

ঈশা:
“আমি কিন্তু মেজদি-কে সমর্থন করি। প্রেমের তো বয়স হয় না। বই-এ পড়েছি, সিনেমাতেও দেখি… বয়স যতই হোক, ভালোবাসাই আসল।”

বাবা (রাগে গর্জে উঠলেন):
“চুপ কর ঈশা! ছোট ছোটোর মতো থাক। সিনেমা আর বইয়ের কল্পনা দিয়ে সংসার চলে না। বাস্তবের কাদা খুব নোংরা, তুই বুঝবি না।”

ঈশা চুপ করে গেল, কিন্তু ঐশীর হাত শক্ত করে ধরে থাকল।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠে চাপা আবেগ—
“শোনো, আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঐশীর চোখের দৃঢ়তা আমি দেখেছি। হয়তো সমাজ কিছু বলবে, কিন্তু মেয়ে যদি সত্যিই সুখ খুঁজে পায়—আমরা কি তার পথে কাঁটা হবো?”

বাবা (চোখ রাঙিয়ে):
“তুমি-ও এসব সমর্থন করছো? অভিনব গুপ্ত—ওর নাম শুনেই লোক হাসবে! বয়সে দ্বিগুণ প্রায়, সমাজে আমরা মুখ দেখাবো কীভাবে?”

ঐশী হঠাৎ বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ল। দু’হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
“বাবা, আমি জানি তুমি রাগ করছো। কিন্তু আমি অভিকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। তুমি যদি না চাও, আমি কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। কিন্তু একটা সুযোগ দাও আমাদের—তুমি নিজে অভির সঙ্গে একবার কথা বলে দেখো।”

বাবা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের চোখে। সেখানে ভয় নেই, আছে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

ঘর নিস্তব্ধ। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ কানে বাজছে। বাবা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, বারান্দার দিকে হেঁটে গেলেন। মুখ ঘুরিয়ে শুধু বললেন—
“এই কথার উত্তর এখন দিতে পারছি না। আমার একটু সময় চাই।”

মা চোখ নামালেন। অর্পিতা চুপচাপ বোনের পাশে দাঁড়াল। ঈশা ফিসফিস করে বলল— “দি, ভয় পাস না… আমি তোকে সমর্থন করব।”

ঐশী ভেজা চোখে বাবার পেছনের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ধ্বনিত হলো—
“বাবা কি কখনও বুঝবে আমাকে?”

চলবে....

পর্ব ২৩: সত্যের মুখোমুখি

এখন সকাল ছটা
অভির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় ঐশীর বুকের ভেতর হালকা ধুকপুকানি। সকাল হয়ে গেলেও দিনের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রাস্তায় লোক কম, নিজের পদশব্দও শোনা যাচ্ছে।

সে মনের ভেতর একদিকে স্বস্তি—অভির মা তাঁকে মেনে নিয়েছেন, আবার অন্যদিকে ভয়—নিজের মা–কে কীভাবে সব বলবে?

কাউকে না বলেই বেরিয়ে যাওয়াতে নিজেদের বাড়ির সদর দরজাও ভিতর থেকে খোলা ভেবে দরজা ঠেলে খুলতে গিয়ে ঐশী দেখলো, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। বুঝলো তার মা বন্ধ করেছে নিশ্চয়ই।

দুবার কলিং বেল বাজানোর মিনিট খানেক পর দরজা খুলে গেলো - সামনে তার মা।

মা: “ঐশীর দিকে চেয়ে - বলি এতো সকালে কোন রাজকার্য করে ফেরা হচ্ছে শুনি? আর দরজা খুলে রেখে চলে গেছিস, অন্তত আমাকে তো বলে বেরোতে পারতিস?"

ঐশী থমকে দাঁড়াল। বুকের ভেতর যেন ধপাস করে শব্দ হলো। মা এগিয়ে এসে তাকালেন, মেয়ের চোখে অদ্ভুত দীপ্তি দেখে কিছুটা অবাক হলেন। মেয়েকে ঘরে ঢুকতে দিয়ে দরজা আবার আটকে দিলেন। ঐশীর পিছন পিছন যেতে যেতে -

মা (সন্দেহ নিয়ে): “তা বলি রাজকার্য করতে কখন বেরোনো হয়েছিলো?”

ঐশী ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে দ্বন্দ্ব—বলবে, না লুকোবে?

সত্য স্বীকার
অবশেষে ধীরে ধীরে কাঁপা গলায় বলল— “মা… আমি অভির বাড়ি গিয়েছিলাম।”

তৎক্ষনাৎ মা - "কে অভি?"

ঐশী - "মা, অভি মানে বিখ্যাত সাহিত্যিক অভিনব গুপ্ত।"

মায়ের চোখ বড় হয়ে গেল। মা (কঠোর স্বরে): “অভির বাড়ি? তোমার থেকে কতো বড়ো তিনি, তুমি তাকে নাম ধরে সম্বোধন করছো!! এই শিক্ষা দিয়েছি আমরা তোমাকে? তাও এতো সকালে? কেন? কি এতো প্রয়োজন ছিলো, যে কাউকে কিছু না জানিয়ে এতো ভোরে তার বাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লো?”

ঐশী চোখ নামিয়ে নিল। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলল— “কারণ আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারছি না মা। আমি অভিকে ভালোবাসি - মানে আমরা দুজনেই দুজনকে খুব ভালোবাসি। আজ অভির মায়ের সামনে সব স্বীকার করেছি।”

মায়ের প্রতিক্রিয়া
কিছুক্ষণ ঘর নিস্তব্ধ। শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
মা ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। তাঁর চোখে বিস্ময়, দুশ্চিন্তা আর এক ধরনের অজানা ভয়।

মা (গম্ভীর গলায়): “ঐশী, তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কী কথা বলছো? অভিনব গুপ্ত একজন কত বড়ো বিখ্যাত ব্যক্তি, আর সবথেকে আসল কথা হলো তোমার থেকে উনি অনেকটা বড়ো… লোকের চোখে কীভাবে দেখাবে? তুমি এখনও কলেজে পড়ছো।”
ঐশীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে মায়ের হাত ধরে বলল— “আমি সব জানি মা। বয়সের ফারাক আছে, লোকে কথা বলবে। কিন্তু আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। ও-ই আমার ভরসা, আমার ঘর।”

মায়ের নীরবতা
মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মা (আবেগ চেপে): “তুমি ছোট্ট থেকে যেটা চেয়েছো আমি সব পূর্ণ করেছি। কিন্তু এই ব্যাপারটা… এটা খুব সহজ নয় মা। সমাজ, লোকজন, বাবার রাগ—সবই ভাবতে হবে।”

ঐশী ভিজে চোখে ফিসফিস করে বলল— “আমি শুধু তোমার আশীর্বাদ চাই মা। তোমরা পাশে থাকলেই সব সামলে নেব।”
মা নীরবে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। তাঁর চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন মেয়ের দৃঢ়তায় একরাশ গর্বও।

চলবে....

পর্ব ২২: প্রথম আলাপ

ভোরের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। অভি আর ঐশী জানালার পাশে বসে নিঃশব্দে চা খাচ্ছিল। দু’জনের চোখে লাজুক হাসি, মনে নীরব উত্তেজনা।

হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা পড়ল।
একটি পরিচিত কণ্ঠ—

অভির মা (বাইরে থেকে):
“অভি, ঘুম ভাঙল নাকি? ভোর হয়ে গেল তো।”

অভি চমকে উঠল। ঐশী কাপে হাত রেখেই স্থির হয়ে গেল। দু’জনের চোখে এক মুহূর্তে একই প্রশ্ন—এখন কী হবে?

অভি আস্তে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি ভয় পেও না, ঐশী। আজকের সকালটাই হোক আমাদের সত্যের শুরু।”

সে দরজা খুলল।

দরজা খুলতেই মা দাঁড়িয়ে। হাতে পুজোর থালা, চোখে হালকা অবাক দৃষ্টি। তিনি ঘরে ঢুকেই ঐশীকে দেখলেন। জানালার পাশে বসে থাকা অপরিচিতা মেয়েটিকে দেখে মুহূর্তে চুপ করে গেলেন।

মা (সন্দেহ আর কৌতূহল মিশ্রিত গলায়):
“অভি… এ কে?”

অভি সামলে নিয়ে শান্তভাবে বলল—
“মা, এ ঐশী। আমার জীবনের আলো।”

ঐশী তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। দু’হাত জোড় করে তারপর পায়ে দুই হাত দিয়ে প্রণাম করে লাজুকভাবে বলল—
“প্রণাম কাকিমা।”

মায়ের হৃদয়ে নরম সুর

মা চুপচাপ কিছুক্ষণ ঐশীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটির চোখেমুখে ভয় নয়, বরং গভীর আন্তরিকতা। ধীরে এসে ঐশীর হাত ধরে বসলেন পাশে।

মা-
“তুমি তো বেশ মিষ্টি দেখতে আর খুব আচার-বিচার আছে দেখছি।" কিন্তু হঠাৎ এই ভোরবেলায়… অভি, তুই তো আমাদের কিছুই জানাসনি?”

অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু গলায় বললো —
“মা, আমি চেয়েছিলাম সঠিক সময়ে তোমাকে জানাতে। আজ ভেবেছি লুকোনো নয়, বরং সত্যিটাই প্রকাশ করা দরকার।”

ঐশী মৃদু গলায় যোগ করল—
“কাকিমা, আমি অভিকে হারাতে চাই না। আমি চাই ওর পাশে থাকতে, ওকে সামলাতে। আপনাদের আশীর্বাদ পেলে তবেই এই সম্পর্ক পূর্ণ হবে।”

মায়ের চোখ ধীরে ভিজে উঠল। তিনি আলতো করে ঐশীর মাথায় হাত রাখলেন আর মৃদুস্বরে বললেন "কিন্তু তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি অভির থেকে অনেকটা ছোট, এমনকি আমার ছোট ছেলে অরিজের থেকেও অনেক ছোট। আমি কি ঠিক বলছি, অভি?"

অভি কাঁপা গলায় বললো — "হ্যাঁ মা তুমি ঠিক বলছো, ও কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।"

মা ঐশীকে বললো -
"তোমার কোনও অসুবিধা নেই তো মা? মানিয়ে নিতে তোমার কোনও অসুবিধা হবে না তো!!"

ঐশী একটু লাজুক হয়ে বললো — "না কাকিমা, আমি সব জেনে বুঝেই এই সম্পর্কে জড়িয়েছি।"

মা (নমনীয় স্বরে)
"তুমি যদি সত্যিই আমার ছেলের সুখ হতে পারো, তবে আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমাদের সঙ্গে থাকবে।”

ঐশীর চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

পরিবারের অন্যরা তখনও অজানা এই বিষয়ে।

মা উঠে দাঁড়ালেন।
“তবে এখন কিছু বলো না বাবাকে। উনি প্রথমে শুনলে একটু রাগ করতে পারেন, ধীরে ধীরে বোঝাতে হবে। আর অরিজ তো এখনও ঘুমোচ্ছে। উঠে সময়মতো অফিসে চলে যাবে। ওকে পরে জানাবো।”

অভি মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে মা। ধীরে ধীরে সব হবে। আজ শুধু চাই তুমি আমাদের পাশে থাকো।”

মা স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকালেন ঐশীর দিকে।
“থাকব বাবা, আর মা, তোমাকে আমি মেয়ে হিসেবেই ভাবতে চাই, বৌমা হিসাবে নয়।”

ঐশী অশ্রু ভেজা হাসি নিয়ে মাথা নাড়ল।

চলবে....

পর্ব ২১: এক নতুন ভোর

ভোরের আলো এখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। জানালার কাঁচে শিশির জমে আছে। ঘর নিস্তব্ধ, শুধু দুই হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন ভেসে আসছে।

অভি আর ঐশী এতটা কাছে, যেন একে অপরের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা গায়ে লাগছে।

অভি ফিসফিস করে বলল—
“ঐশী, এতটা কাছে তুমি আগে কখনো এসেছো?”

ঐশী চোখ নামিয়ে নিল, ঠোঁটে কাঁপন।
“না অভি দা… কিন্তু আজ এসেছি, কারণ আমি চাই আমার বুকের ভেতর তোমার ঠিকানা হোক।”

অভির বুক ধক করে উঠল। সে ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো ঐশীর হাতের ওপর রাখল। ঐশীর হাত কাঁপছিল, কিন্তু সরে গেল না। বরং শক্ত করে চেপে ধরল অভির হাত।

অভি (মৃদু হাসি নিয়ে):
“তোমার হাত তো কাঁপছে।”

ঐশী হালকা শ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল—
“কাঁপছে ভয় থেকে নয়… তোমার ছোঁয়ার অপেক্ষা থেকে।”

অভি কিছু বলল না। শুধু ধীরে ঐশীর গাল স্পর্শ করল। আঙুলের ছোঁয়ায় ঐশী কেঁপে উঠল। চোখ বুজে ফিসফিস করে বলল—
“এভাবে ছুঁয়ো না অভি দা… আমি নিজেকে সামলাতে পারব না।”

অভি তার কানে ঝুঁকে ফিসফিস করল—
“তাহলে আজ নিজেকে আমাকে সঁপে দাও। আর অভি দা নয়। শুধু অভি।”

ঐশী মাথা তুলে তাকাল। তার চোখ আধভেজা, তবু ভেতরে জ্বলছে অনন্ত আকাঙ্ক্ষা।
“আমি তো সেই জন্যই এসেছি, অভি দা… তোমার কাছে নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে।”

অভি আরও আবেগঘন হয়ে ঐশীর আরও অন্তরঙ্গ হয়ে বললো - "শুধু অভি"।

অভি আর থামতে পারল না। ধীরে ধীরে ঠোঁট রাখল ঐশীর ঠোঁটে। প্রথমে নরম, তারপর উষ্ণ, দীর্ঘ। ঐশীর হাত দুটো অভির কাঁধ জড়িয়ে ধরল, শরীর গলে গেল অভির বুকে।

চুম্বন ভাঙতেই ঐশী শ্বাস নিতে নিতে ফিসফিস করল—
“তুমি জানো না, আমি কতদিন ধরে এই মুহূর্তের জন্য বেঁচে আছি।”

অভি তার চুলে মুখ ডুবিয়ে দিল। চুলে ভিজে ফুলের সুবাস।
“ঐশী… তোমার গন্ধে আমি মাতাল হয়ে যাচ্ছি।”

ঐশী হেসে উঠল, বুকের ভেতর থেকে হালকা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
“আমি চাই, তুমি আমার গায়ের প্রতিটি গন্ধ, প্রতিটি কাঁপন চিনে নাও। আজ থেকে আমি শুধু তোমার।”

অভি তার কাঁধ থেকে আঙুল সরিয়ে গলায় রাখল। ঐশীর শরীর শিহরন তুলল।
ঐশী (চোখ বুজে):
“অভি… তোমার আঙুল আমার গলায় নামলেই কেন মনে হয় বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠছে?”

অভি ফিসফিস করে বলল—
“কারণ সেই আগুনে আমিও পুড়ছি।”

তারপর আবার ঠোঁট মিলল—এবার আরও গভীর, আরও দীর্ঘ। দু’জনেই যেন সময় ভুলে গেল।

অভি চুম্বনের ফাঁকে বলল—
“তুমি আমার রক্তে মিশে যাচ্ছো, ঐশী।”

ঐশী চোখ আধবোজা করে উত্তর দিল—
“তাহলে আজ থেকে আমি তোমার রক্ত, তোমার শ্বাস, তোমার শরীর।”

অভি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঐশী তার কোমল হাতের স্পর্শ অভির দুই গালে বুলিয়ে অভিকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে তার দুই কোমল বাহুতে জাপটে ধরে অভির চুলে আঙুল বোলাতে লাগলো আর ফিসফিস করে বলল—
“আমায় আর হারিয়ো না, অভি। আমি তোমার ঘর।”

অভি ঐশীর বাহুর অন্তরঙ্গ উষ্ণতায় নিজেকে পুরো সপে দিলো ঐশীর শরীরে আর ফিসফিস করে বললো -
“তুমি শুধু ঘর নও, ঐশী… তুমি আমার ভোর, আমার রাত, আমার সবকিছু।”

ঘরের ভেতর ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে পাখির কোলাহল, ভেতরে দু’জনার নিঃশব্দ মিলন—যেখানে প্রেম আর শরীর একসাথে গেঁথে গেল।

অভি অনেকক্ষণ বাহুবন্ধ হয়ে ঐশীর বুকে মাথা রেখে নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল। শুধু দু’জনের হৃদস্পন্দন যেন একসাথে তাল দিচ্ছিল।

হঠাৎ ঐশী আলতো করে অভির চুলে হাত রেখে হেসে বলল—
“তুমি জানো, এতক্ষণ আমি শ্বাসই নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।”

অভি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল—
“তাহলে আজ থেকে প্রতিটি শ্বাস আমার ওপর ছেড়ে দাও।”

ঐশী চোখ নামিয়ে লাজুকভাবে হেসে ফেলল। তার গাল লালচে হয়ে উঠেছে।
“তুমি জানো না, এই মুহূর্তে আমি কতটা তোমার… আমি আর কিছুই ভয় পাই না।”

অভি ধীরে ধীরে তার আঙুল দিয়ে ঐশীর চুল সরিয়ে দিল। জানালার ভোরের আলোয় ঐশীর মুখ যেন দীপ্ত হচ্ছিল।
অভি (মৃদু স্বরে):
“তুমি এত সুন্দর… আমি ভেবেছিলাম আমার জীবনে আর আলো ফিরবে না। অথচ তুমি এসেছো ভোর হয়ে।”

ঐশী নরম গলায় উত্তর দিল—
“তাহলে আমাকে হারাতে দিও না। আমি চাই প্রতিটি সকাল তোমার জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কাটাতে।”

অভি হেসে বলল—
“আজ তাহলে প্রথম সকাল শুরু হলো।”

অভি উঠতে চাইলে ঐশী তার হাত টেনে নিলো।
“কোথায় যাচ্ছো?”

অভি মৃদু হেসে উত্তর দিল—
“চা বানাতে। আজ তোমার জন্য বিশেষ চা।”

ঐশী হাসতে হাসতে বলল—
“তাহলে আমি বসে থাকব, আর তুমি আমাকে খাওয়াবে। আজ থেকে আমার চাও কেবল তোমার হাতের।”

অভি রান্নাঘরে গেল। কিছুক্ষণ পর ট্রেতে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এলো। দু’জন জানালার পাশে বসল। বাইরে সূর্য উঠছে, ভিতরে তাদের চোখে নতুন দিনের আলো।

ঐশী কাপ হাতে নিয়ে তাকাল অভির দিকে—
“জানো, এই ভোরটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো। মনে হচ্ছে আমি সত্যি তোমার ঘর পেয়েছি।”

অভি কাপ নামিয়ে ঐশীর হাত ধরল।
“এটা স্বপ্ন নয়, ঐশী। এটা আমাদের নতুন শুরু।”

ঐশী ধীরে মাথা নামিয়ে অভির কাঁধে হেলান দিল। জানালার বাইরে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, আর তাদের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক অনন্ত প্রতিশ্রুতি।

চলবে....

পর্ব ৩৪: অদৃশ্য ফাঁদ

সোমবার বিকেল। অভি একটি কলেজের গেস্ট লেকচার দিয়ে বেরোচ্ছে। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে এক মেসেজ— “অভি, আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে একটু দেখা করো। জরুরি।” ...